কী দেখে গেমিং ল্যাপটপ কিনবেন?



গেমিং ল্যাপটপ কেনার সময় একটি কথা মাথায় রাখতে হবে। তা হলো, এটি সাধারণের ব্যবহারের জন্য তৈরি নয়। যাঁরা গেমভক্ত এবং গেমের উন্নত অভিজ্ঞতা পেতে চান, তাঁদের জন্য গেমিং ল্যাপটপ। বাংলাদেশের বাজারেও এখন গেমিং ল্যাপটপ পাওয়া যাচ্ছে।

এইচপি, আসুস, এমএসআই, রেজার, ডেলের মতো ব্র্যান্ডগুলোর গেমিং ল্যাপটপ রয়েছে। গেমিং ল্যাপটপের দাম তুলনামূলক বেশি হয়। তাই অর্থ খরচ করে এ ধরনের ল্যাপটপ কেনার আগে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। গেমিং ল্যাপটপ বিষয়ে এইচপি, ডেল, আসুসের কর্মকর্তারা কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

হার্ডওয়্যার উপযুক্ত কি না (সিপিইউ‍+জিপিইউ)

অ্যাসাসিনস ক্রিড বা ওয়াচডগসের মতো গেমগুলো খেলতে প্রচুর প্রসেসিং ক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে। তাই এমন প্রসেসর দরকার, যাতে স্বচ্ছন্দে তা খোলা যায়। ল্যাপটপে বাধামুক্ত গেমিং অভিজ্ঞতা পেতে ইনটেল কোর আই ৭ কোয়াড কোর প্রসেসর থাকা চাই। তবে যাঁরা খরচ কিছুটা কম করতে চান, তাঁরা ডুয়াল কোর আই ৫ নিতে পারেন। এইচপির ওমেন সিরিজ বা লেনোভোর লিজিয়ন সিরিজে ইনটেল কোর আই ৭ কোয়াড কোর প্রসেসর আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের প্রসেসরযুক্ত গেমিং ল্যাপটপের দাম হয় এক লাখ টাকার ওপরে। সিপিইউর পাশাপাশি গেমিং ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে জিপিইউ সমান গুরুত্বপূর্ণ। জিপিইউ মানে গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট। গেমিং ল্যাপটপে গ্রাফিকস ভালো না হলে গেমের অভিজ্ঞতা ভালো হবে না। এনভিডিয়া জিফোর্স জিটিএক্স থাকতে হবে। হাই এন্ড ল্যাপটপে জিটিএক্স ১০৮০ বা জিটিএক্স ১০৭০ জিপিইউ থাকে। তবে জিটিএক্স ১০৬০ বা ১০৫০ জিপিইউ গেমের চাপ নিতে পারে।

যথাযথ র‍্যাম ও ভির‍্যাম
গেমিং ল্যাপটপের ক্ষেত্রে র‍্যাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই বেশি র‍্যাম ও ভিডিও র‍্যাম বা ভির‍্যাম আছে—এমন ল্যাপটপ পছন্দ করতে পারেন। র‍্যাম যত বেশি হবে, গেমের অভিজ্ঞতা তত উন্নত হবে। গেমিং ল্যাপটপে কমপক্ষে ৮ জিবি র‍্যাম থাকা চাই। এর কম হলে সে গেমিং ল্যাপটপের দিকে না যাওয়া ভালো।

ডিসপ্লে চাই ঝকঝকে
গেমিং ল্যাপটপে রেজুলেশন কোনোভাবেই যেন ১৯২০ বাই ১০৮০–এর কম না হয়। টপ এন্ডের ল্যাপটপগুলোয় কিউএইচডি (২৫৬০ বাই ১৪৪০) বা ফোরকে (৩৮৪০ বাই ২১৬০) রেজুলেশন থাকে। তবে ডিসপ্লে যত উন্নত হয়, দাম তত বেশি হতে দেখা যায়। যেমন এমএসআই টাইটান গেমিং ল্যাপটপে ফোরেক রেজুলেশন আছে। এর দাম চার লাখ টাকার ওপরে। তবে হার্ডকোর গেমারদের ক্ষেত্রে ১৯২০ বাই ১০৮০ যথেষ্ট। স্ক্রিনের মাপ বড় হলে ভালো। ১৭ দশমিক ৩ ইঞ্চি মাপের ডিসপ্লেতে বিশেষ সুবিধা পাবেন গেমার।

প্রচুর স্টোরেজ
গেমিং ল্যাপটপ মানে স্টোরেজে ঘাটতি থাকা চলবে না। গেমিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্টোরেজ ফাঁকা থাকা। এসএসডি ও এইচডিডি দুটোই থাকতে পারে। কমপক্ষে এক টেরাবাইট হার্ডডিস্ক থাকতে হবে। অধিকাংশ গেম খেলার সময় ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন হবে।

কি–বোর্ড ও টাচপ্যাড
ল্যাপটপে গেম খেলতে গেলে কিবোর্ড হওয়া চাই গেমের উপযোগী। কি–বোর্ডে স্বচ্ছন্দ না হলে বা টাচপ্যাড ব্যবহারবান্ধব না হলে গেম খেলার মজা থাকে না। অধিকাংশ গেমিং ল্যাপটপ নির্মাতা এখন কি–বোর্ড ও টাচপ্যাডকে গেমারদের উপযোগী করে তৈরি করছে। কাস্টোমাইজ করা ব্যাকলিট কি–যুক্ত ল্যাপটপ পছন্দ করতে পারেন।

সাউন্ড
গেমিং মানেই শব্দের খেলা। ল্যাপটপে যদি গেমের আউটপুট শব্দ ভালো না আসে, তবে গেমের মজা নষ্ট হয়। গেমিং ল্যাপটপ কেনার সময় অডিও যন্ত্রাংশের মান অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। স্পিকার পাশে না সামনে অবস্থিত সেটি খেয়াল করতে হবে। সামনের দিকে থাকা স্পিকার সুবিধাজনক।

গঠন: গেমের উপযোগী ল্যাপটপ যেন মজবুত হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

কুলিং সিস্টেম: ল্যাপটপে বাতাস বের হওয়ার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা আছে কি না এবং কুলিং সিস্টেম উন্নত কি না, তা অবশ্যই দেখে নিতে হবে।

গেমিং ল্যাপটপের দাম: এইচপির ওমেন সিরিজের এনও ২৩ টিএক্স মডেলের দাম ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এনও ২৫ টিএক্সের দাম ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, সিইও ৩০ টিক্সের দাম ১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। সিইও ৩১ টিক্সের দাম ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। আসুসের জিএল ৭০২ ভিএম-বিএ ৩৫৯ মডেলটির দাম ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, জিএল ৫৫৩ ভিডি-এফওয়াই ১৩৯ মডেলটির নাম ৮৮ হাজার টাকা, জিএক্স ৫০১ ভিএল-জিজেড ০৩৭টি মডেলটির দাম ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। ডেলের ৭৫৬৭ মডেলের ল্যাপটপ পাওয়া যাবে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।

গ্রুপ অ্যাডমিনদের অর্থ আয়ের সুবিধা দিচ্ছে ফেসবুক



ফেসবুক গ্রুপ অ্যাডমিনদের জন্য অর্থ আয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে ফেসবুক। ফেসবুক গ্রুপের জন্য সাবস্ক্রিপশন মডেল আনার কথা বলেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। বড় ফেসবুক গ্রুপগুলোতে সদস্য হতে গেলে গ্রুপ অ্যাডমিনরা সদস্যদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সাবস্ক্রিপশন ফি নিতে পারবেন। বুধবার এক ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রুপ সাবস্ক্রিপশন চালুর বিষয়টি ঘোষণা করে ফেসবুক। এর আগে ফেসবুক গ্রুপগুলোতে বিনা মূল্যে ঢোকার সুবিধা ছিল।

এখন অ্যাডমিনরা প্রিমিয়াম সাব গ্রুপ চালুর সুবিধা পেতে পারেন। এতে প্রিমিয়াম সাব গ্রুপের সদস্যরা অ্যাডমিনদের কাছ থেকে আরও মানসম্পন্ন কনটেন্ট পাবেন। তবে অর্থের বিনিময়ে অনেকেই এই সুবিধাটি নিতে চাইবেন না। ফলে গ্রুপগুলো থেকে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।

ফেসবুক জানিয়েছে, যে অ্যাডমিনরা গ্রুপগুলোকে বড় করে তুলতে চায় এবং এর পেছনে নিজের সময় ব্যয় করে, তাদের আয়ের সুযোগ করে দিতেই নতুন টুলটি যুক্ত করা হচ্ছে। সাব গ্রুপে আরও বেশি করে পোস্ট দিয়ে, ভিডিও তৈরি করে, অনলাইন মিটআপ ও ইভেন্ট তৈরির মাধ্যমে এ টাকা আয় করা যাবে।
আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েডের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সাবস্ক্রিপশন বিষয়টি ব্যবস্থপনার সুযোগ পাবেন ব্যবহারকারী। তথ্যসূত্র: ইকোনোমিক টাইমস।

পেজ চালানোর নতুন নিয়মকানুন বেঁধে দিচ্ছে ফেসবুক



ফেসবুক পেজ চালানোর ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য নতুন ফিচার ঘোষণা করেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার ফেসবুক নতুন এ ফিচারের ঘোষণা দেয়। নতুন ফিচারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘পেজেস পাবলিশিং অথোরাইজেশন’ বা পেজ প্রকাশের অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যাপক অনুসারী আছে—এমন পেজগুলোর ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রয়োজন হবে।


এ ছাড়া পেজটি কোন দেশ থেকে তৈরি, তার লোকেশন বা অবস্থান অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। কোনো পেজ যদি মার্জ করা হয় বা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাও দেখার সুবিধা থাকতে হবে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, যাঁরা ফেসবুক পেজ চালান বা ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কিছুটা কঠোর হতে যাচ্ছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। পেজে পোস্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতির মধ্যে থাকতে হবে। তাঁদের এখন টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং কোনো কিছু পোস্ট করার আগে তাঁদের অবস্থান (প্রাইমারি হোম লোকেশন) ফেসবুককে নিশ্চিত করতে হবে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, ভুয়া খবর প্রকাশ ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে তারা এ প্রক্রিয়া চালু করছে। হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধেও এতে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। জোর করে অনুমোদনের এ প্রক্রিয়া চলতি মাসের শেষ দিকে শুরু হবে।

পেজ হিস্ট্রি পেজের মধ্যে কোন পেজের সঙ্গে কোন পেজ কখন একত্র করা হয়েছে, তা প্রদর্শন করা হবে। এতে ওই পেজের অনুসারীদের কাছে পেজের স্বচ্ছতা থাকবে। এ ছাড়া অনুসারীরা সচেতন থাকতে পারবেন। পেজের সঙ্গে ‘পিপল হু ম্যানেজ দিস পেজ’ নামে একটি সেকশন বা বিভাগ যুক্ত হবে, যেখানে পেজ ব্যবস্থাপকদের সম্পর্কে তথ্য থাকবে।

ফেসবুক ছাড়াও ইনস্টাগ্রামে এ ফিচার চালু করতে পারে ফেসবুক। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রে বড় আকারের পেজগুলোয় এ ফিচার পরীক্ষা চালাচ্ছে ফেসবুক।

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভুয়া খবর ও ডেটা প্রাইভেসি-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির পর ফেসবুকের কাছ থেকে এ পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা এল। ফেসবুক পেজের ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন ভুয়া খবর ঠেকানোর পথে একধাপ অগ্রগতি বলেই মনে করা হচ্ছে।

কবিতা হলো প্রাঞ্জল মিথ্যা, এই মনোরম মিথ্যা বলতে বলতে আমি এখন ক্লান্ত - মহাদেব সাহা


প্রেম ও দ্রোহের কবি হিসেবে একসময় তিনি ছিলেন খুব জনপ্রিয়। সেই কবি মহাদেব সাহা এখন কানাডাপ্রবাসী। তবে বিদেশ-বিভুঁই ভালো লাগে না তাঁর, দ্রুতই ফিরতে চান দেশে। ৫ আগস্ট এই কবির ৭৫তম জন্মদিন। বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টেলিফোনের মাধ্যমে নেওয়া এ সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন তাঁর কবিতাভাবনা, প্রেম ও উপলব্ধির কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ
আলতাফ শাহনেওয়াজ: ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনার ধানগড়া গ্রামে আপনার জন্ম। তারুণ্যে আপনারা যখন কাব্যচর্চা করছেন, এই বাংলায় তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। কবি হিসেবে আপনার গড়ে ওঠার পেছনে এই প্রেক্ষাপটের কতটা অবদান রয়েছে?মহাদেব সাহা: বিস্তর অবদান রয়েছে। আমার যখন কৈশোরকাল, তখন ভাষা আন্দোলন হয়েছে। ইতিহাসের অনেক ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষার্ধ দেখেছি, দেশভাগ দেখেছি, মানুষের দেশত্যাগও দেখেছি। এসব দেখতে দেখতে আমার বড় হয়ে ওঠা।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় আমি স্কুলের নিচু শ্রেণির ছাত্র হলেও সবকিছু মনে আছে আমার। আদতে আমাদের কবিতা গড়ে উঠেছে মানুষের জাগরণ, গণ-আন্দোলন—এসবের উষ্ণ নিশ্বাসে, জীবন আর মাটির গন্ধে। এটাই আমাদের কবিতার স্বাতন্ত্র্য ও মূল শক্তি। যখন কলেজে পড়ি, ততদিনে বাঙালির নবজাগরণের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ, ১৯৬২ সালের আন্দোলন, ’৬৬-তে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় দফা ও স্বাধিকারের সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালির যে জাগরণ সূচিত হয়েছিল, আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। শুধু প্রত্যক্ষদর্শী বললে ভুল হবে, আমি এগুলোর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছি। কবিতায় আমি যে জীবন, সমাজ ও মানুষকে অনুভব করেছি, এগুলো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছে।
১৯৬৯ সাল। বাংলা বিভাগে পড়ার পর আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে থেকে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ওই মিছিলে আমি তাঁর পাশেই ছিলাম। আমার গায়েও গুলি লাগতে পারত। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ফিরিয়ে দাও রাজবংশ’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলাম স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে। তো, এত কথা বলার অর্থ হলো, আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, একই সঙ্গে বেড়ে উঠেছে আমাদের কবিতাও।

আলতাফ: আপনার অনেক কবিতায়ই দেখা যায় বিবৃতির প্রাধান্য। কোনো বিষয়কে খোলামেলাভাবে কেবল বলে যাওয়া। আছে পুনরাবৃত্তিও। মোটা দাগে এগুলো আপনার কবিতার বৈশিষ্ট্য। শুধু আপনার নয়, আপনার প্রজন্মের অনেকের কবিতায় এই বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে। আপনার বা আপনাদের প্রজন্মের কবিদের এ রকম কবিতা লেখার কারণ কী?
মহাদেব: আমরা কি একই রকম বৈশিষ্ট্যে কবিতা লিখেছি? নিশ্চয়ই তা নয়। তবে এটা সত্য, যে সময়ে আমরা বেড়ে উঠেছি, পরিপুষ্ট হয়েছি—তার মধ্যে ছিল মিছিল, আন্দোলন আর অবরুদ্ধ মানুষের প্রকাশিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এ কারণে হয়তো আমাদের কবিতার মধ্যে বলে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। সে হিসেবে আমাদের কবিতা নিশ্চয়ই কিছুটা বিবৃতিপ্রধান। এটা ইচ্ছাকৃত। কারণ, মানুষের সঙ্গে আমরা সরাসরি যোগাযোগ করতে চেয়েছি। জানি যে, ‘জেনুইন পোয়েট্রি কমিউনিকেটেস বিফোর ইট ইজ আন্ডার ট্রুথ’। তাই মানব-সংযোগকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি আমরা। সম্ভবত এ কারণেই কলকাতার কবিতা থেকে আলাদা হয়েছে আমাদের কবিতা। কেবল রূপক ও চিত্রকল্পখচিত বিমূর্ত কবিতার দিকে আমরা যেতে চাইনি। তখন আমাদের কাছে কাব্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি আরাধ্য ছিল মানুষ, মানুষের মুখ। দেখো, রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’, ‘দেবতার গ্রাস’, ‘সামান্য ক্ষতি’, ‘সাজাহান’, এমনকি ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ও রোমান্টিক বিবৃতিতে ভরা। তবে আমাদের সময়ে দু-একজন অবশ্য চিত্রধর্মী কবিতার দিকে গিয়েছিল, সেসব কবিতা টেকেনি। মানুষ গ্রহণ করেনি সেগুলো।
আলতাফ: আপনি কীভাবে নিশ্চিত যে চিত্রকল্পময় কবিতা—আপনার ভাষায় যা ‘চিত্রধর্মী’—সেগুলো টেকেনি?
মহাদেব: একদম নিশ্চিত। আমাদের কবিতা মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। শত শত বই বিক্রি হয়েছে। কবিতার বই প্রথম সংস্করণে ১ হাজার ২০০ কপি ছাপা হওয়ার চল শুরু হয় আমাদের সময় থেকে। তারপর তিন-চার মাসের মধ্যে ওই বইয়ের প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে যায়। স্বাধীনতার একদম পরপর ১৯৭২-এ বেরোনো আমার প্রথম কবিতার বই এই গৃহ এই সন্ন্যাস-এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তিন মাসের মধ্যে সংস্করণ শেষ। আমি, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ুন কবির, হ‌ুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান—সবার ভেতরে এই প্রবণতা ছিল। না, কথাটা পুরোপুরি ঠিক হলো না। আবুল হাসানের কবিতা ছিল আলাদা। নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব—কবিতায় এসব সন্ধান করেছে সে। তার কবিতা হলো আত্মমন্ময় কবিতা। আর আমরা সন্ধান করেছিলাম জীবন-মন্ময় কবিতা—জীবন ও মাতৃভূমি। দেশ, দেশের রাজনীতি—এগুলোকে তখন ঠিকঠাকমতো বুঝে উঠতে পারেনি হাসান। বোধ হয় সে কারণেই ওর কবিতায় সমাজ ও দেশকে সেভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একসঙ্গে থাকলেও কাব্যাদর্শের দিক দিয়ে সে ছিল আমাদের চেয়ে খানিকটা দূরবর্তী অবস্থানে।
আলতাফ: কিন্তু অনেকে এমন অভিযোগও করেন, কবিতায় এই অবিরল বলে যাওয়া বা বিবৃতিপ্রবণতার কারণে আপনাদের কবিতা কখনোবা তরল হয়ে গেছে।
মহাদেব: আমার তা মনে হয় না। আমার বরং মনে হয়, এতে আমাদের কবিতা সমৃদ্ধই হয়েছে। কেননা, আবার বলছি, আমাদের কবিতা জীবনমুখী। এখানে প্রেম, কাম—এগুলোর পাশাপাশি বিশেষভাবে ছিল রাজনীতি। ফলে কবিতা হেঁটেছে জনমানুষের একই সমতলে। শামসুর রাহমান তো আমাদের এক দশক আগের কবি, তিনি দেশের প্রধান কবি হয়ে উঠলেন কেন? যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মানুষের অবলম্বন ছিল তাঁর কবিতা—সে ‘আসাদের শার্ট’ বা ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’—যে নামই বলি না কেন। বিবৃতির যে ধারা, তা শামসুর রাহমান থেকে শুরু। ওই ধারায় আমি এবং আমরাও লিখেছি, যার যার স্বতন্ত্র স্বরে। আমাদের পরেও লেখা হয়েছে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহসহ আরও অনেকে লিখেছেন। সেসব কবিতা জনপ্রিয়ও হয়েছে।
আলতাফ: জনপ্রিয় ধারার কবি আপনি। তাই কি এ কথা বলতে চাচ্ছেন, পাঠকের কাছে যাওয়া, বই বিক্রি হওয়া, সাধারণ মানুষের কাছে আদৃত হওয়া—এগুলো কবিতার বড় উদ্দেশ্য?
মহাদেব: অবশ্যই। এগুলো খুবই বড়। আমাদের আগে কবিতা থেকে পাঠক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আমাদের আগপর্যন্ত অনেক কবিকে নিজস্ব অর্থে বা বন্ধুবান্ধবের টাকায় বই বের করতে হয়েছে। সেদিক থেকে আমরা ছিলাম ব্যতিক্রম। প্রকাশক আগ্রহ করে আমাদের বই বের করেছেন এবং তা বিক্রিও হয়েছে। আর খ্যাতি, জনপ্রিয়তা, কবিতার চরণগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরা—এসব কিছুকে তোমরা যদি মূল্য না দাও, তাতে কবিতার কিন্তু কোনো ক্ষতি হবে না। হ্যাঁ, তরুণ বয়সে বিদ্রোহ থাকে, আমরাও করেছি; তবুও বলতে চাই, জীবনমুখী বা মানুষের কাছে যাওয়া কবিতা—এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের কবিতার মূলধারা।
আলতাফ: প্রেমের কবি হিসেবে বেশ সুখ্যাতি আছে আপনার। আপনারা তো জীবন দেখে ও জীবন থেকে জীবনমুখী কবিতা লিখেছেন। আপনার প্রেমের কবিতাগুলোও কি জীবন থেকে পাওয়া?
মহাদেব: বাংলা কবিতার দিকে তাকাও, কী দেখতে পাও? প্রেম আছে বাংলা কবিতায় প্রথম থেকেই। প্রেম অনুভবের বস্তু। প্রেমের অনুভূতি ছাড়া কোনো মানুষ বাঁচতে পারে না। প্রেম তো ভেতরেই থাকে, বাস্তবে এবং স্বপ্ন-কল্পনায় থাকে। প্রত্যেক কবি হয়তো এসব থেকে, বিশেষ কোনো অনুভূতি থেকেই প্রেমের কবিতা লেখেন।
আলতাফ: আপনার জীবনে প্রেম আসেনি? সেই প্রেম আপনাকে কাব্যরচনায় উদ্বুদ্ধ করেনি?
মহাদেব: হয়তো করেছে, আবার করেওনি। কল্পিত প্রেম নিয়ে হয়তো লিখেছি। নিজের জীবনের প্রেমের কথা কী আর বলব! অসংখ্য নারীর ভালোবাসা আমি পেয়েছি। সেই কলেজজীবন থেকে নারীদের ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এর মধ্যে আবার অন্য কিছু খুঁজবে না, আরও সরাসরি বললে দৈহিকতাকে খুঁজবে না, কারণ, কামনাতাড়িত প্রেমের কথা আমি বলছি না। আমার কাছে প্রেম ও মাতৃস্নেহের মধ্যে কোনো পার্থক্য কখনো ছিল না, এখনো নেই। প্রেম তো এক রকমভাবে মাতৃস্নেহই। একটা ঘটনা বললেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ১৯৬১ সালে আমি ঢাকা কলেজে পড়ি, উচ্চমাধ্যমিকে। থাকি হোস্টেলে। তখন হিন্দু ছাত্রদের জন্য আগামসিহ লেনে একটা ছাত্রাবাস ছিল। একে আমরা বলতাম হোস্টেল। ওই হোস্টেলে বসবাসকালে আমি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লাম—টাইফয়েড। সে সময় টাইফয়েড ছিল কঠিন অসুখ। আমাদের হোস্টেলের পাশের বাড়িতে অপূর্ব এক সুন্দরী ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। হোস্টেলের সামনের খোলা জায়গায় আমরা ব্যাডমিন্টন খেলতাম, তিনি বারান্দায় বসে সেই খেলা দেখতেন। আমার সঙ্গে তাঁর খুব দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। তবে আমাকে দেখে তিনি হাসতেন, মিষ্টি করে হাসা। বিনিময়ে আমিও হাসতাম। ভাব বিনিময় মাত্র এটুকু। আমরা তাঁকে বলতাম উষাদি। তিনি জানতেন আমি কবিতা লিখি।
তো, হোস্টেলে যখন অমি অসুস্থ হলাম, জ্বরের ঘোরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম, তখন অন্যদের কাছ থেকে শুনে রাতের বেলা উষাদি চলে এলেন আমার রুমে। তখন আমি সংজ্ঞাহীন। সারা রাত তিনি আমার মাথায় জলপট্টি দিয়েছেন। এরপর সকালবেলা চলে গেছেন। বড় ভাগ্য না থাকলে এটা হয় না! একে তুমি প্রেমও বলতে পারো, মাতৃস্নেহও বলতে পারো। কবিতা লিখে আর কী পাওয়া যায়, বলো?
তারপর উষাদির সঙ্গে আমার আর মাত্র একবারই দেখা হয়েছিল। সেটা ঘটল তখন, যখন টাইফয়েড-আক্রান্ত আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে আমার গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলাম। উষাদি হাত নেড়ে আমাকে বিদায় দিলেন, আমিও হাত নাড়লাম। ও-ই শেষ। কিন্তু ওই প্রেম, ওই স্নেহ আজও আমার মনের ভেতর রয়ে গেছে।
আগেই বলেছি, অনেক নারীর ভালোবাসার আবেশ আমাকে স্পর্শ করেছে। তবে মজার ব্যাপার এই যে তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আমার দেখা হয়নি, শুধু কথা হয়েছে। প্রেমের এসব কথাবার্তা বাদ দাও। তোমাকে একটা কথা স্পষ্ট করে বলি, প্রেমের কবিতা লিখলেও আমি কিন্তু প্রেমিক নই। আমার লেখা প্রেমের কবিতা পড়ে অনেকে আমাকে ভালোবেসেছে, কিন্তু আমি কাউকে ভালোবাসিনি। ভালোবাসা শিখিনি। চিঠি নিয়ে আমি অনেক কবিতা লিখেছি। চিঠি পেতেও আমার ভালো লাগে। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো আমি মা ছাড়া কাউকে তেমনভাবে চিঠি লিখিনি। প্রেমের যোগ্য মানুষ আমি নই, তাই বোধ হয় এ জীবনে অফুরন্ত প্রেম পেয়েছি।
আলতাফ: ‘কেউ জানে না একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেড়ায়’ আপনার লেখা ‘মানুষের বুকে এত দীর্ঘশ্বাস’ নামে কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি। এই পঙ্‌ক্তির মতো আপনার কবিতার অনেক কবিতার পঙ্‌ক্তিতেই আছে দীর্ঘশ্বাস, আছে দুঃখ, বিষণ্নতা, বিষাদ। আপনার কবিতায় এত বিষাদ কেন?
মহাদেব: বিরহকেও আমি প্রেম মনে করি, বিষাদকে আনন্দ মনে করি। বিষাদের মধ্যেই আছে আনন্দ। কেবল কি আমার কবিতাতেই বিষাদ আছে? রবীন্দ্রনাথের কবিতার পাতায় পাতায় ভরা রয়েছে দুঃখ। গীতবিতান-এর প্রতিটি পাতা তো দুঃখ আর অশ্রুতে ভেজা। ‘আওয়ার সুইটেস্ট সংস আর দৌজ দ্যাট টেল অব স্যাডেস্ট’—শেলির উক্তি। তাই বলতে পারি, বিষাদই প্রথম কবিতা। আদি কবি বাল্মীকির প্রথম যে শ্লোক-উচ্চারণ: ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠা তমগম শাশ্বতী সমা’—এর মধ্যে কী আছে? বিষাদ।
আলতাফ: বাংলাদেশের আবাস গুটিয়ে স্ত্রীসহ কানাডায় ছেলের কাছে চলে গেলেন। কেন? এর নেপথ্যে কি কোনো অভিমান আছে?
মহাদেব: না, কারও প্রতি কোনো অভিমান নেই। দেশ ছেড়ে কানাডাতে গিয়েছি বাধ্য হয়ে। দেশে আমার কোনো জীবিকা ছিল না। উপরন্তু আমার ও নীলার (মহাদেব সাহার স্ত্রী) চিকিৎসা ও ওষুধপত্রের জন্য প্রতি মাসেই বিপুল টাকা ব্যয় হচ্ছিল। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ছেলে তীর্থর কাছে কানাডায়, কানাডার এই শীতলতম অঞ্চল ক্যালগেরিতে চলে এলাম। এখন ফোনে আর কী বলব! নিজের কথা বলতে একদমই ভালো লাগে না। কবিতা লিখে আমি মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত করতে পারিনি। আমার সংগৃহীত বইপত্র সব দিয়ে এসেছি বাংলা একাডেমিকে। যে সময় আমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হওয়ার কথা, পুরস্কার-সম্মাননায় প্রীত হওয়ার কথা, সে সময় আমি মাঠ ছেড়ে দিয়েছি, রেসে নেই। আমার সম্বল শুধু কিছু কবিতা, গান আর বাংলা বর্ণমালা। এসব নিয়েই সুখে-দুঃখে থাকতে চাই আমি। জন্মভূমি ছেড়ে কারও কি ভালো লাগে? আমারও লাগে না। কিন্তু কী করব! এখন ভাবছি, ঢাকায় একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই জোগাড় করতে পারলেই দেশে ফিরব।
আলতাফ: আসছে ৫ আগস্ট আপনার ৭৫তম জন্মদিন। দীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন, অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ও ঢের। এত দিন পেরিয়ে এসে আপনার উপলব্ধি কী?
মহাদেব: কবিতাও চির-অমর কিছু নয়। পোয়েট্রি ইজ আ পানিশমেন্ট। আমি মনে করি, কবিতা লেখা এক রকম শাস্তি।পৃথিবীর সব বড় কবি—কিটস, বায়রন, র‍্যাঁবো, বোদলেয়ার, ডিলান টমাস, মায়াকোভস্কি, মাইকেল বা রবীন্দ্রনাথ—তাঁদের দিকে তাকাও, দেখবে সবাই একই শাস্তি ভোগ করেছেন। শেষ জীবনে ছেলেকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।’ আদতে আমার তেমন কিছু বলার নেই। আমার উপলব্ধি জানতে চাও? কবিতা হলো প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ। প্রকৃতির প্রতিশোধ ভয়ংকর। কবিতা হলো প্রাঞ্জল মিথ্যা। এই মনোরম মিথ্যা বলতে বলতে আমি এখন ক্লান্ত।

সবার পক্ষে লেখক হওয়া সম্ভব নয় : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়


পশ্চিমবঙ্গে তথা বাংলা সাহিত্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন অন্যতম কথাসাহিত্যিক। ২ নভেম্বর ১৯৩৫ সালে ময়মনসিংহ জেলায় তাঁর জন্ম। তাঁদের আদিনিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। বাবার রেলওয়ের চাকরির সুবাদে শৈশব ও কৈশোরকালে তাঁকে একরকম যাযাবর জীবনযাপন করতে হয়েছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায় কলকাতায়। এরপর বিহার, আসাম, কুচবিহার, পূর্ববাংলা, উত্তরবাংলা ঘুরে সবশেষে আবার কলকাতাতেই ফিরে আসেন। মিশনারি স্কুল ও বোর্ডিংয়ে কাটে তাঁর স্কুলজীবন। ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। বিএ করেন কলকাতা কলেজে। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর শেষে স্কুলশিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। 
একসময় আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে সাংবাদিকতা পেশাকে বেছে নেন। বর্তমানে ‘দেশ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’ প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়। প্রথম কিশোর উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ লিখে ১৯৮৫ সালে লাভ করেন বিদ্যাসাগর পুরস্কার। তা ছাড়া আনন্দ পুরস্কার দুবার- ১৯৭৩ ও ১৯৯০ সালে। তাঁর ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮৯ সালে লাভ করেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। যাও পাখি, মানবজমিন, দূরবীণ, পার্থিব, চক্র, পারাপার ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। বাংলাদেশে তাঁর ‘যাও পাখি’, ‘মানবজমিন’ উপন্যাস নিয়ে নির্মিত হয়েছে ধারাবাহিক নাটক। এ ছাড়া বেশ কিছু গল্প অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে টেলিভিশন নাটক। খ্যাতিমান এ লেখকের মুখোমুখি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অঞ্জন আচার্য।
অঞ্জন আচার্য : বাংলাদেশে আপনার গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে বেশ কয়েকটি টেলিভিশন নাটক নির্মিত হয়েছে। সেগুলো দর্শকনন্দিতও হয়েছে বেশ। অনুভূতি কেমন?

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় : ভালো, বেশ ভালো। আমার বইয়ের পাঠক বাংলাদেশে আছে। একই সঙ্গে আমার গল্প-উপন্যাস নিয়ে তৈরি করা নাটকও প্রশংসিত হয়েছে বা হচ্ছে। তার মানে আমার পাঠক ও দর্শক— দুই-ই আছে। হা হা হা।

‘যাও পাখি’, ‘মানবজমিন’ উপন্যাসটি নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটক হয়েছে। নির্মাতাদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছি কয়েকবার। এ ছাড়া আমার আশ্চর্য প্রদীপ, একটি অমীমাংসিত রহস্যসহ বেশ কিছু গল্প নিয়ে নাটক তৈরি করা হয়েছে।
অঞ্জন : টিভি দেখা হয় আপনার?

শীর্ষেন্দু : খুব দেখা হয়। কাজের প্রয়োজনে দেখতে তো হয়ই, অবসর পেলেও আমি টিভি দেখি। তবে বেশি দেখি কার্টুন ছবি ও টিভি সিরিয়াল। 
অঞ্জন : কার্টুন?

শীর্ষেন্দু : হ্যাঁ কার্টুন। ‘টম অ্যান্ড জেরি’ আমার খুব পছন্দের কার্টুন। আর কার্টুন ছাড়া বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল দেখতে হয় কাজের প্রয়োজনে।
অঞ্জন : লেখালেখির প্রসঙ্গে আসি বরং। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কবিতা ক্লাস’ বইয়ের শুরুতেই বলেছেন : “কেউ কেউ কবি নয়, সকলেই কবি’— অর্থাৎ যে কেউ কবি হতে পারেন যদি লেখালেখির কলাকৌশলটা তাঁর জানা থাকে। আপনিও কি তাই মনে করেন?

শীর্ষেন্দু : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কী প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন তা আমি বলতে পারব না। তবে আমার মনে হয় সবার পক্ষে লেখক হওয়া সম্ভব নয়। হতে চাইলেই সবাই নিজের ইচ্ছেমতো কিছু হতে পারে না। আর লেখালেখির বিষয়টা একটু আলাদা। সবার লেখার ধাৎ থাকে না। লেখালেখি একটা সাধনালব্ধ শিল্প। এ শিল্পগুণ ভেতরে থাকতে হবে। তারপর নিরলস সাধনা করে যেতে হবে। যেমন ধরো, গান। গান তো আমরা কমবেশি সবাই গাই। স্নানের ঘরে বা বন্ধুদের আড্ডায়। তাই বলে কি আমরা সবাই গায়ক বনে গেলাম? না। কিন্তু এটা বলা যেতে পারে, কেউ যদি গানের লাইনে লেগে থাকে, দীর্ঘদিন গানের ব্যাকরণ চর্চা করে তবে গানের তাল-লয় সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা জন্মাতে পারে। এই বলে সবাই শিল্পী হবে— তা বিশ্বাস করি না। লেখালেখির ক্ষেত্রেও তাই। গাদা গাদা চিঠি লিখলেই কেউ রবীন্দ্রনাথ হয়ে যাবে না। মগজে কিছু থাকতে হবে।
অঞ্জন : আপনার লেখালেখির শুরুটা জানতে চাই।

শীর্ষেন্দু : বিষয়টি আমার বহু সাক্ষাৎকারেই উল্লেখ করেছি। ছোটবেলা থেকেই পড়ার পোকা ছিলাম। হাতের কাছে যা পেতাম, তাই পড়তাম। খুব ছোটবেলাতেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক, তারাশঙ্কর পড়া শেষ করে ফেলি। যাকে বলে অকালপক্ব। ওই লেখা পড়তে পড়তে নিজের ভেতর লেখালেখির একধরনের টান অনুভব করতাম। শুরু সেখান থেকেই।
অঞ্জন : আপনার জীবনে এক সংকটময় মুহূর্ত পার করেছেন। সেই বিষয়টা একটু শেয়ার করবেন?

শীর্ষেন্দু : আমার তো মনে হয় প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কোনো না কোনো সংকটময় সময় পার করতে হয়। তাকে পার করেই জীবন এগিয়ে নিতে হয়। ওই সময়টার কথা আমার অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। নানা টানাপড়েনে চলতে চলতে নিজের জীবনের প্রতি একসময় মায়া চলে যায়। তখন এক বন্ধুর সহায়তায় ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সান্নিধ্য পাই। ঠাকুরের বাণী আমার জীবনে বাঁচার আশা জাগায়। আর বেঁচে আছি বলেই আজ আমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। না হলে, লক্ষকোটি নামহীন সাধারণ মানুষের মতোই মরতে হতো।
অঞ্জন : সম্ভবত এ বিষয়টি আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’র নায়ক শ্যাম চরিত্রের মাঝে দেখা যায়।

শীর্ষেন্দু : শ্যামের সাথে আমার জীবনের কিছু কিছু অংশ মিল আছে। তবে শ্যাম চরিত্রকে পুরোপুরি আমার প্রতিবিম্ব ভাবলে ভুল হবে। শ্যামের বিষণ্ণতা ও তা থেকে পরিত্রাণের জন্য নির্বিকার থাকাটা আমার সাথে মিলে যায়। বাকিটুকু কল্পনা ও অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। 
অঞ্জন : লেখালেখিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

শীর্ষেন্দু : এর উত্তর আমি হয়তো কিছু আগে দিয়েছি। এই যে আমি, তোমরা যাকে লেখক হিসেবে চেনো-জানো, আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছো, নানা সময়ে আমাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ করো—এই যে সম্মাননা, তা সবই তো এই লেখালেখির জন্য পেলাম। ওটা আমার ধ্যান— আমার পূজা। 
অঞ্জন : কোন সময়টায় সাধারণত লিখতে বসেন?

শীর্ষেন্দু : লেখাটা ভেতরে ভেতরে সব সময় চলতে থাকে, জমাট বাঁধতে থাকে সারা দিন। তবে রাতের বেলাটাকেই লেখার জন্য বেছে নিয়েছি। ওই সময়টায় লিখতে ভালো লাগে।
অঞ্জন : আপনার অধিকাংশ বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা থাকে, পাঠক হিসেবে আপনি সর্বগ্রাসী। তবে ধর্মগ্রন্থ, থ্রিলার, কল্পকাহিনী আপনার প্রিয়।

শীর্ষেন্দু : আমি সব পড়ি। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, সতীনাথ, টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, গোর্কি, কাফকাসহ অনেকের লেখা এখনো পড়ি। ওরাই আমার লেখার জায়গাটি জাগিয়ে তুলেছে—এখনো তুলে যাচ্ছে। তা ছাড়া ভ্রমণকাহিনী আমার খুব ভালো লাগে। ইদানীং ধর্মবিষয়ক গ্রন্থই বেশি পড়া হয়।
অঞ্জন : কোনো এক বিজয়া দশমীর দিনে, আপনারা যাকে বলেন ভাসান, ওই দিন গঙ্গার ওপর ভাসমান লঞ্চ থেকে সরাসরি অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘ইটিভি বাংলা’র এক অনুষ্ঠানে আপনি বলেছিলেন যে, আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন। বিজ্ঞানের এই যুগে ভূত-প্রেত বলে সত্যিই কি কিছু আছে বলে আপনি মনে করেন?

শীর্ষেন্দু : হ্যাঁ, ভূত আছে। এটা আমি বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাসের পেছনে যুক্তিসংগত কারণ আছে।
অঞ্জন : কী কারণ?

শীর্ষেন্দু : আমি নিজের চোখে ভূত দেখেছি।
অঞ্জন : ওটা তো দৃষ্টিভ্রমও হতে পারে, হ্যালুসিনেশন।

শীর্ষেন্দু : না। আমারটা দৃষ্টিভ্রম ছিল না। এ বিষয়টি আমি বহুবার বহু জায়গায় বলেছি। কথাটা কেউ বিশ্বাস করলে করুক, বা না-করুক। ঈশ্বর যেমন মানি, তেমনি ভূতও মানি। 
অঞ্জন : মৃত্যু প্রসঙ্গটি আপনার লেখায় প্রচুর লক্ষ করা যায়। ওটা নিয়ে কিছু বলুন।

শীর্ষেন্দু : সকলেরই মৃত্যু ভয় আছে। কারো কম, কারো বা বেশি। আমি মৃত্যুর প্রেমে পড়িনি। মৃত্যু আমার বন্ধু নয়— শত্রু।
অঞ্জন : নানা প্রশ্নে আকীর্ণ বস্তুগ্রাহ্য এই জগৎ ও জীবন। আপনি আপনার লেখায় সব সময় জীবনের গভীরে নিহিত হিরন্ময় তাৎপর্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন অথবা এই নশ্বর জীবনের মানে কী— এমনতর প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেছেন। জীবন সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত মত জানতে চাচ্ছি।

শীর্ষেন্দু : শোনো অঞ্জন, মানুষের বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে মুখ্য বিষয়। এই আমি তোমার সামনে বসে আজ কথা বলছি— তা তো জীবনেরই দান। তুমি হয়তো আমার কথাগুলো লিপিবদ্ধ করবে, পত্রিকায় ছাপবে, লোকে তা পড়বে— জানবে। এই সবকিছু নিয়েই তো জীবন। আমি আমার জীবনযাপনে সব সময় সত্য খুঁজে ফিরি।
অঞ্জন : আপনার সাহসী গোয়েন্দা চরিত্র শবর দাশগুপ্ত সত্যজিতের ফেলুদার মতো তীক্ষ্ণ ও বিচক্ষণ। অনেকে মনে করেন শবর দাশগুপ্ত ফেলুদার নবতর সংস্করণ। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

শীর্ষেন্দু : পৃথিবীর সব গোয়েন্দা চরিত্রে কিছু কিছু মিল পাওয়া যায় সত্যি। কিছু কমন গুণাবলি, যেমন- সাহসিকতা, বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি ইত্যাদি মিল থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে শবর দাশগুপ্তকে ফেলুদার নব্য সংস্করণ বলাটা পাঠকের পড়াশোনার সীমাবদ্ধতাকেই প্রমাণ করে। ফেলুদা ছিলেন শখের গোয়েন্দা, আই মিন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। শবর দাশগুপ্ত কিন্তু তা নয়। তিনি প্রফেশনাল ডিটেকটিভ- সিআইডির কর্মকর্তা। দুই চরিত্রের মধ্যে কোনো মিলই তো দেখছি না।
অঞ্জন : আপনি তো অনেক শিশুকিশোর, রম্য সাহিত্য রচনা করেছেন। পাতালঘর, কুঞ্জপুকুরের কাণ্ড, মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি, দুধসাগরের দ্বীপ, পটাশগড়ের জঙ্গলে, ঝিলের ধারে বাড়ি, সোনার মেডেল, নৃসিংহ রহস্য, বক্সার রতন, গজাননের কৌটা, গোঁসাই বাগানের ভূত, চক্রপুরের চক্করে, গৌরের কবচ, বনি, নবীগঞ্জের দৈত্য— এমন সব রচনার মুড আপনার কীভাবে আসে? 

শীর্ষেন্দু : মাঝে মাঝে সিরিয়াস বিষয় নিয়ে লিখতে লিখতে বড় ক্লান্ত হয়ে উঠি। তখন সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এমন সিলি বিষয়ে হাত দিই। তবে সেখানে আমার শৈশবের অনেক প্রসঙ্গ চলে আসে। শৈশব থেকে শব্দ চয়ন করে আমি ওই সব লিখি। ভেতরটা তখন ফ্রেশ লাগে। তা ছাড়া লেখার মধ্যে বহুমাত্রিকতা বা বৈচিত্র্য না থাকলে লেখক হিসেবে টিকে থাকা বড় কঠিন। 
অঞ্জন : নতুনদের লেখা পড়া হয় আপনার? কেমন করছে তারা? ওদের সম্পর্কে কিছু বলার যদি থাকে।

শীর্ষেন্দু : যারা লিখছে তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো লিখছে। এপার বাংলা, ওপার বাংলা, দুই দেশেই। তবে আরো পরিশ্রম করতে হবে। আরো গভীরে যেতে হবে। আধুনিক লেখার নামে যা কিছু তা লিখলে সময় তাকে ধারণ করবে না। সময় বড় নিষ্ঠুর। সবাইকে সে আশ্রয় দিতে চায় না। যারা গেঁড়ে বসতে পারে- তারাই পাবে সময়ের স্বীকৃতি। আর একটা কথা বলতে চাই। এখনকার অনেকেরই খ্যাতির পেছনে এমনভাবে ছুটে যেন, খ্যাতি কোনো বাউন্ডারি। আগে তো নিজের ভিতটাকে শক্ত করতে হবে- তারপর না এগিয়ে চলা। খ্যাতির পেছন পেছন ছুটলেই যদি তাকে পাওয়া যেত, তাহলে তো কোনো কথাই ছিল না। সবাই সবকিছু ফেলে ওই ছোটাছুটিই করত। সবকিছুর জন্য অধ্যবসায় চাই। লিখতে হলে পড়তে হবে অনেক। স্কুল-কলেজের মতো কোনো ফাঁকিবাজি পড়া নয়। কেবল পড়ার জন্য পড়া নয়; শব্দের অর্থ বুঝে পড়তে হবে। বাক্যের প্রয়োগ নিয়েও ভাবতে হবে। তবে কোনো লেখকের দ্বারা প্রভাবিত হলে চলবে না। নিজের স্টাইলটা নিজেরই তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ যে লেখক সাহিত্য ভুবনে টিকে আছে, তা কিন্তু নকল করে নয়। নিজের স্বতন্ত্র প্রতিভাতেই টিকে আছে। পাঠক অনুকরণীয় কিছু গ্রহণ করে না।
অঞ্জন : অনেক ভালো লাগল দাদা আপনার সঙ্গে কথা বলে। ঋদ্ধ হলাম। আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

শীর্ষেন্দু : তোমাকেও ধন্যবাদ। আশীর্বাদ করি, ভালো থেকো।

হৃদয় তোমারে পায় যে দেখিতে, রয়েছ মননে মননে


সকাল থেকেই পায়চারি করছেন তিনি। এক মুহূর্তের জন্যেও থামেন নি। এই দিনটা আসলেই অস্থির হয়ে যান কেমন যেন। মতি মিয়া পাশে বসে আছে লুঙ্গি কাছা দিয়ে, তার চোখ চেয়ারের পাশে রাখা ধোঁয়া ওঠা কফির দিকে। ডাহুক পাখির সালুন দিয়ে গরম ভাত খাওয়ার পর এরকম ধোঁয়া ওঠা এক মগ কফি খেতে পারলে সেই রকম স্বাদ পাওয়া যেত বলে তার ধারণা। হুমায়ূন আহমেদ আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর চেয়ারে এসে বসলেন। কফির মগ তুলে ঠোঁটে ছোঁয়াতে গিয়েও আর ছোঁয়ালেন না। মতির কফির দিকে নিবদ্ধ থাকা চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন-
– মতি বলো তো এই দিনটিতে আমি এতো অস্থির থাকি কেন?
– জানিনা তো স্যার। ৩ বছর ধইরাই দেখতাসি এই দিনটা আসলে আপনে কেমন যেন অস্থির হইয়া যান। কফিটা ঠান্ডা হইয়া যাইতেসে স্যার।
– কারণ আছে মতি। কারণ আছে। আজকের দিনেই আমি পৃথিবী ছাড়া হয়েছিলাম। চান্নি পসর রাতের অপেক্ষায় রত আমি, জোছনাহীন এক রাতে বিদায় নিয়েছিলাম। প্রতি বছর এই দিনটা ঘুরে আসলে আমি আমার প্রিয়জনদের সাত আকাশ নিচে কাঁদতে দেখি। প্রতিজনের কান্নার দমকে আমি অস্থির হয়ে যাই। ইচ্ছে হয় ওদের গিয়ে বলি- তোমরা কেঁদো না, আমি ভালো আছি, এখন তোমরা ভালো থাকো।
– স্যার আপনেরে সবাই ভালবাসে দেইখাই কান্দে। আমার জন্য জানেন কেউ কান্দে না। স্যার কফিটা ঠান্ডা হইয়া গেলে খাইলে সোয়াদ পাইবেন না কিন্তু।
– আমি তো চাই না কেউ কাঁদুক। আমাকে যদি মনে রাখতে হয় তাহলে তাদের হাসির মাঝে রাখুক। আমার লেখা পড়ে, আমার বানানো সিনেমা-নাটক দেখে ওরা যে আনন্দ পেয়েছে সে আনন্দ নিয়ে হাসুক। আমার কাছের মানুষেরা যারা আমাকে কাছে পেয়েছে তারা আমাকে নিয়ে ঘেরা সুখস্মৃতি স্মরণ করে হাসুক।
– এইটা একটা হক কথা কইছেন স্যার। মর্জিনারে এখনো যখন হাসতে শুনি মনডা খুশি হইয়া যাই। মাইয়া মাইনষের হাসি আর গরম গরম কফি বাইরে গরল ভিতরে মিষ্টি। স্যার কফিটা কিন্তু…
– আরে রাখো তোমার কফি। আমি এখনো বুঝে পেলাম না যে আমার এতো এতো সৃষ্টি, হিমু-মিসির আলি সাহেব, এমনকি শুভ্রকে না দিয়ে আমাকে কেন তোমার সঙ্গ দেয়া হল। আমি তোমার চরিত্র লিখতাম যেমন বিরক্তি নিয়ে এখন তোমার সাথে কথাও বলি সেই একই বিরক্তি নিয়ে।
– স্যার গোসসা কইরেন না। গোসসা কইরা কি লাভ। কফির মগটা দেন গরম কইরা আনি, ঠান্ডা হইয়া গেসে মনে হয়।
– থাক গরমই আছে। আমি খাবো না। তুমিই খাও।
হুমায়ূন আহমেদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। নিচে তাকিয়ে দেখলেন বিশাল এক চাঁদ উঠেছে আকাশে। চান্নি পসর রাত। হাই পাওয়ারের চশমাটা মুছে চোখে দিয়ে দেখলেন নিনিত খিলখিল করে হাসছে ভাইয়ের কোন এক কথায়। একটা নীল শাড়ি পরা মেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে হলুদ পাঞ্জাবি পরা কারও অপেক্ষায় কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানুষটি নীল পাঞ্জাবি পরে আসায় কপট রাগ দেখিয়ে সেও হাসতে লাগলো। আরও দেখলেন চশমা হারিয়ে ফেলা এক ছেলেকে হাত না ধরে রাস্তায় দিক নির্দেশনা দিয়ে হাটাচ্ছে এক রাগী তরুণী। ছেলেটা সব আবছা আবছা দেখায় মেয়েটি হাসি চেপে রাগী রাগী গলায় বলছে- জানি তো, সব হাত ধরার ধান্ধা। চশমা হারাবা কেন! এখন নিজে নিজে পথ চলো। হুমায়ূন আহমেদ বুকভরা ভালোলাগা নিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসলেন আর সামনে তাকিয়ে দেখলেন মতি মিয়া হাসি হাসি মুখে সুরুৎ সুরুৎ করে কফি খাচ্ছে।

কান্ডারী হুশিয়ার! - কাজী নজরুল ইসলাম


দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার 
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার! 

দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ, 
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ? 
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। 
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার। 

তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান! 
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান। 
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান, 
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার। 

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন 
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন। 
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? 
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার 

গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ, 
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ! 
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ? 
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার! 

কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর, 
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর! 
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর! 
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার। 

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান, 
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান 
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ? 
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!

সংকল্প - কাজী নজরুল ইসলাম


থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে,- 
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে। 
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে 
ছুটছে তারা কেমন করে, 
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে, 
কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে।। 

কেমন করে বীর ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে, 
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বরগ পানে। 
জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি 
যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি, 
কেমন করে আঞ্ছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে, 
কেমন জোরে টানলেসাগর উথলে ওঠে জোয়ার বানে। 

কেমন করে মথলে পাথার লক্ষী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে, 
কিসের অভিযানে মানুষ চলছে হিমালয় চুড়ে। 
তুহিন মেরু পার হয়ে যায় 
সন্ধানীরা কিসের আশায়; 
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরেঃ 
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন 'মঙ্গল' হতে আসছে উড়ে।। 

কোন বেদনার টিকিট কেটে চন্ডু-খোর এ চীনের জাতি 
এমন করে উদয়-বেলায় মরণ-খেলায় ওঠল মাতি। 
আয়ার্ল্যান্ড আজ কেমন করে 
স্বাধীন হতে চলছে ওরেঃ 
তুরষ্ক ভাই কেমন করে কাঁটল শিকল রাতারাতি! 
কেমন করে মাঝ গগনে নিবল গ্রীসের সূর্য-বাতি।। 

রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে- 
আকাশ বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে। 
আমার সীমার বাঁধন টুটে 
দশ দিকেতে পড়ব লুটেঃ 
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়েঃ 
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।

হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক - কাজী নজরুল ইসলাম


হিন্দু-মুসলিম দুটি ভাই 
ভারতের দুই আঁখি তারা 
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম চারা।। 

যেন গঙ্গা সিন্ধু নদী 
যায় গো বয়ে নিরবধি 
এক হিমালয় হতে আসে, এক সাগরে হয় গো হারা।। 

বুলবুল আর কোকিল পাখী 
এক কাননে যায় গো ডাকি, 
ভাগীরথী যমুনা বয় মায়ের চোখের যুগল ধারা।। 

ঝগড়া করে ভায়ে ভায়ে 
এক জননীর কোল লয়ে 
মধুর যে এ কলহ ভাই পিঠোপিঠী ভায়ের পারা।। 

পেটে ধরা ছেলের চেয়ে চোখে ধরারা মায়া বেশী, 
অতিথী ছিল অতীতে, আজ সে সখা প্রতিবেশী। 
ফুল পাতিয়ে গোলাপ বেলী 
একই মায়ের বুকে খেলি, 
পাগলা তা'রা আল্লা ভগবানে ভাবে ভিন্ন যারা।।

বস্তীর মেয়ে - জসীম উদ্‌দীন

বস্তীর বোন, তোমারে আজিকে ছেড়ে চলে যেতে হবে,
যত দূরে যাব তোমাদের কথা চিরদিন মনে রবে।
মনে রবে, সেই ভ্যাঁপসা গন্ধ অন্ধ-গলির মাঝে,
আমার সে ছোট বোনটির দিন কাটিছে মলিন সাজে।
পেটভরা সে যে পায় না আহার, পরনে ছিন্নবাস,
দারুণ দৈন্য অভাবের মাঝে কাটে তার বারোমাস।
আরো মনে রবে, সুযোগ পাইলে তার সে ফুলের প্রাণ,
ফুটিয়া উঠিত নানা রঙ লয়ে আলো করি ধরাখান।
পড়িবার তার কত আগ্রহ, একটু আদর দিয়ে,
কেউ যদি তারে ভর্তি করিত কোন ইস্কুলে নিয়ে;
কত বই সে যে পড়িয়া ফেলিত জানিত সে কত কিছু,
পথ দিয়ে যেতে জ্ঞানের আলোক ছড়াইত, পিছু পিছু!
নিজে সে পড়িয়া পরেরে পড়াত, তাহার আদর পেয়ে,
লেখাপড়া জেনে হাসিত খেলিত ধরনীর ছেলেমেয়ে।

হায়রে দুরাশা, কেউ তারে কোন দেবে না সুযোগ করি,
অজ্ঞানতার অন্ধকারায় রবে সে জীবন ভরি।
তারপর কোন মূর্খ স্বামীর ঘরের ঘরনী হয়ে,
দিনগুলি তার কাটিবে অসহ দৈন্যের বোঝা বয়ে।
এ পরিনামের হয় না বদল? এই অন্যায় হতে
বস্তীর বোন, তোমারে বাঁচাতে পারিবনা কোনমতে?
ফুলের মতন হাসিখুশী মুখে চাঁদ ঝিকি মিকি করে,
নিজেরে গলায়ে আদর করিয়া দিতে সাধ দেহ ভরে।
তুমি ত কারুর কর নাই দোষ, তবে কেন হায়, হায়,
এই ভয়াবহ পরিনাম তব নামিছে জীবনটায়।

এ যে অন্যায়, এ যে অবিচার, কে রুখে দাঁড়াবে আজ,
কার হুঙ্কারে আকাশ হইতে নামিয়া আসিবে বাজ।
কে পোড়াবে এই অসাম্য-ভরা মিথ্যা সমাজ বাঁধ,
তার তরে আজ লিখিয়া গেলাম আমর আর্তনাদ।
আকাশে বাতাসে ফিরিবে এ ধ্বনি, দেশ হতে আর দেশে,
হৃদয় হইতে হৃদয়ে পশিয়া আঘাত হানিবে এসে।
অশনি পাখির পাখায় চড়িয়া আছাড়ি মেঘের গায়,
টুটিয়া পড়িবে অগ্নি জ্বালায় অসাম্য ধারাটায়!
কেউটে সাপের ফণায় বসিয়া হানিবে বিষের শ্বাস,
দগ্ধ করিবে যারা দশ হাতে কাড়িছে পরের গ্রাস।
আলো-বাতাসের দেশ হতে কাড়ি, নোংরা বস্তী মাঝে,
যারা ইহাদের করেছে ভিখারী অভাবের হীন সাজে;
তাহাদের তরে জ্বালায়ে গেলাম শ্মাশানে চিতার কাঠ,
গোরস্তানেতে খুঁড়িয়া গেলাম কবরের মহা-পাঠ।
কাল হতে কালে যুগ হতে যুগে ভীষণ ভীষণতর,
যতদিন যাবে ততজ্বালা ভরা হবে এ কন্ঠস্বর।
অনাহারী মার বুভুক্ষা জ্বালা দেবে এরে ইন্ধন,
দিনে দিনে এরে বিষায়ে তুলিবে পীড়িতের ক্রন্দন।
দুর্ভিক্ষের স্তন পিয়ে পিয়ে লেলিহা জিহ্বা মেলি,
আকাশ-বাতাস ধরণী ঘুরিয়া করিবে রক্ত কেলি।


---মাটির কান্না