স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’
এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না৷
তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হদৃয় মাঠখানি?
জানি, সেদিনের সব স্মৃতি ,মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত৷ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ … ৷
হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প৷
সেই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর৷
না পার্ক না ফুলের বাগান, — এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়৷
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে৷
কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক৷
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে৷
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্যে কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: “কখন আসবে কবি?’ “কখন আসবে কবি?’
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের৷
কবি- নির্মলেন্দু গুণ

বঙ্গ-বন্ধু

মুজিবর রহমান।
ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,
জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞঝা-অশনি বেয়ে ।
বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা-মার।
হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যে অঙ্গার ;
দিনে দিনে হয়ে বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে,
দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান ছিল প্রকাশের মুখে ;
তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি
ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি।
মুজিবর রহমান।
তব অশ্বেরে মোদের রক্তে করায়েছি পূত-স্নান।
পীড়িত-জনের নিশ্বাস তারে দিয়েছে চলার গতি,
বুলেটে নিহত শহীদেরা তার অঙ্গে দিয়েছে জ্যেতি।
দুর্ভিক্ষের দানব তাহারে অদম্য বল,
জঠরে জঠরে অনাহার-জ্বালা করে তারে চঞ্চল।
শত ক্ষতে লেখা অমর কাব্য হাসপাতালের ঘরে,
মুর্হুমুহু যে ধবনিত হইছে তোমার পথের পরে।
মায়ের বুকের ভায়ের বুকের বোনের বুকের জ্বালা,
তব সম্মুখ পথে পথে আজ দেখায়ে চলিছে আলা।
জীবন দানের প্রতিজ্ঞা লয়ে লক্ষ সেনানী পাছে,
তোমার হুকুম তামিলের লাগি সাথে তব চলিয়াছে।
রাজভয় আর কারাশৃঙ্কল হেলায় করেছ জয়।
ফাঁসির মঞ্চে-মহত্ব তব কখনো হয়নি ক্ষয়।
বাঙলাদেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমুর্ত রাজ,
প্রতি বাঙালীর হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত-তাজ।
তোমার একটি আঙ্গুল হেলনে অচল যে সরকার।
অফিসে অফিসে তালা লেগে গেছে-স্তব্ধ হুকুমদার।
এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী-জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।
সেনাবাহিনীর অশ্বে চড়িয়া দম্ভ-স্ফীত ত্রাস,
কামান গোলার বুলেটের জোরে হানে বিষাক্ত শ্বাস।
তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালীর মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।
ধন্য এ কবি ধন্য এ যুগে রয়েছে জীবন লয়ে,
সম্মুখে তার মহাগৌরবে ইতিহাস চলে বয়ে।
ভুলিব না সেই মহিমার দিন, ভাষার আন্দোলনে ।
বুরেটের ভয় তুচ্ছ করিয়া ছেলেরা দাঁড়াল রণে ।
বরকত আর জব্বার আর সালাম পথের মাঝে,
পড়ে বলে গেলো, “আমরা চলিনু ভাইরা আসিও পাছে।”
উত্তর তার দিয়েছে বাঙালী, জানুয়ারী সত্তরে,
ঘরের বাহির হইল ছেলেরা বুলেটের মহা-ঝড়ে।
পথে পথে তারা লিখিল লেখন বুকের রক্ত দিয়ে,
লক্ষ লক্ষ ছুটিল বাঙালী সেই বাণী ফুকারিয়ে।
মরিবার সে কি উন্মাদনা যে, ভয় পালাইল ভয়ে,
পাগলের মত ছোট নর-নারী মৃত্যুরে হাতে লয়ে।
আরো একদিন ধন্য হইনু সে মহাদৃশ্য হেরি,
দিকে দিগনে- বাজিল যেদিন বাঙালীর জয়ভেরী।
মহাহুঙ্কারে কংস-কারার ভাঙিয়া পাষাণ দ্বার,
বঙ্গ-বঙ্গ শেখ মুজিবেরে করিয়া আনিল বার।
আরো একদিন ধন্য হইব, ধন-ধান্যেতে ভরা,
জ্ঞানে-গরিমায় হাসিবে এদেশ সীমিত-বসুন্ধরা।
মাঠের পাত্রে ফসলেরা আসি ঋতুর বসনে শোভি,
বরণে সুবাসে আঁকিয়া যাইবে নকসী-কাঁথার ছবি।
মানুষ মানুষ রহিবে না ভেদ, সকলে সকলকার,
এক সাথে ভাগ করিয়া খাইবে সম্পদ যত মার।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর রুপালীর তার পরে,
পরাণ ভুলানো ভাটিয়ালী সুর বাজিবে বিশ্বভরে।
আম-কাঁঠালের ছায়ায় শীতল কুটিরগুলির তলে,
সুখ যে আসিয়া গড়াগড়ি করি খেলাইবে কুতুহলে।
আরো একদিন ধন্য হইব চির-নির্ভীকভাবে,
আমাদরে জাতি নেতার পাগড়ি ধরিয়া জবাব চাবে,
“কোন অধিকারে জাতির স্বার্থ করিয়াছ বিক্রয়?”
আমার এদেশ হয় যেন সদা সেইরুপ নির্ভয়।

কবি - জসীম উদ্‌দীন

কই হারালো !

মামুনূর রশিদ
মামুনূর রশিদ

কই হারালো, কই হারালো
তোমার এতো ভালোবাসা।
কই হারালো , কই হারালো
তোমার এতো স্বপ্ন-আশা।
আমার হাতে হাতটি রেখে,
কথা দিলেছিলে থাকবে সাথে,
হাজার জন্ম পাড়ি দেবে-
শুধুই শুধু ভালোবেসে।
হৃদের পাতায় স্বপ্ন এঁকে
আবার তুমি ভেঙ্গে দিলে,
এ কেমন খেলা ছিল,
জানতে বড় ইচ্ছে করে?
এটা কেমন খেল্লে খেলা,
এখন ভক্তি এখনি হেলা।
ভালোবাসা ভালো না- কি,
না কি শুধু সর্বনাশ ।
তোমায় না দেখলে বন্ধু,
হতো না আমার বিশ্বাস।

কবি - মামুনূর রশিদ

আরেকটি সুভাষ চাই

১

দেশ স্বাধীনতা পেয়েও যেন
মনে হয় আজও পরাধীন
অরাজকতা ও দুর্নীতির কাছে
করেছে নিজেকে সমর্পণ
ক্লান্ত চোখে চারিদিকে খুঁজে
চলেছি গর্বের সুভাষ কে নিশিদিন।

অসমাপ্ত রয়ে গেছে আজও তোমার
দেখা সেই স্বপ্নের ভারত
এ কেমন লুকোচুরি খেলার সাধ
জাগলো সেদিন তোমার
সেই যে চলে গেলে অভিমান করে
এলেনা আর ফেরত।

আজও তোমার ফেরার পথ চেয়ে
বসে আছি সকলে মিলে
শুনেছি কত বীরত্বের ও সাহসিকতার
গল্প তোমার, সবার মুখে
বাঙালির গর্ব, দেশের গর্ব বাঁচতে
শিখিয়ে ছিলে সেদিন মাথাতুলে।

তোমাকে দেখে আমারও সাধ জাগে
সেই স্বপ্নের ভারত কে খুঁজে পেতে
হারিয়ে গেছে সেই ভারত আজ
নোংড়া রাজনীতির খেলায়
পারবে কি কেউ নেতাজীর মত
আজ আবার গর্জে উঠতে ?

রামের বনবাস হয়েছিলো চোদ্দ বছরের
সকল ভারতবাসী ছিলাম তোমার
ফিরে আসার অপেক্ষায়
আজও হলোনা ভেদ সেই রহস্য
অন্তর্ধানের।

চিনলো না সেদিন ভারতবাসী
এমন একটি অমূল্য রতন
তাইতো আমাদের হারাতে হোলো
নেতাজীকে চিরতরে
আজও দিতে রাজি রক্ত তোমায়
যদি আবার শুনি সেই গর্জন ।।

কবি -  বিনিতা দত্ত 
বিনিতা দত্ত
বিনিতা দত্ত।

লেখার সময় কাল -24.01.2020 

ঐক্যবদ্ধ!

মামুনূর রশিদ
মামুনূর রশিদ


ধর্মের নামে বিভাজনে
স্বার্থ কাদের আছে?
চলুন সবাই সোচ্চার হই
থামিয়ে দিই এবার তাদের ।
শুনবো কত শত আর,
সংখ্যা লঘু সংখ্যা লঘু,
বলতে পারেন ভাই।
সংখ্যা গুরু আছেন যারা
করছেন কি কিছু তারা?
আসুন সবাই এক সাথে,
ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে,
সকলেরে ভালোবেসে,
ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাতেই
শান্তি আনি সারা দেশে।
কবি - মামুনূর রশিদ



বাবুমশাই – শঙ্খ ঘোষ

‘সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা!
বেঁচে ছিলাম ব’লেই সবার কিনেছিলাম মাথা
আর তাছাড়া ভাই
আর তাছাড়া ভাই আমরা সবাই জেনেছিলাম হবে
নতুন সমাজ, চোখের সামনে বিপ্লবে বিপ্লবে
যাবে খোল-নলিচা
যাবে খোল-নলিচা পালটে, বিচার করবে নিচু জনে’
-কিন্তু সেদিন খুব কাছে নয় জানেন সেটা মনে
মিত্র বাবুমশয়
মিত্র বাবুমশয় বিষয়-আশয় বাড়িয়ে যান তাই
মাঝেমধ্যে ভাবেন তাদের নুন আনতে পান্তাই
নিত্য ফুরোয় যাদের
নিত্য ফুরোয় যাদের সাধ-আহ্লাদের শেষ তলানিটুকু
চিরটা কাল রাখবে তাদের পায়ের তলার কুকুর
সেটা হয় না বাবা
সেটা হয় না বাবা’ বলেই থাবা বাড়ান যতেক বাবু
কার ভাগে কী কম প’ড়ে যায় ভাবতে থাকেন ভাবুক
অমনি্ দু’চোখ বেয়ে
অমনি্ দু’চোখ বেয়ে অলপ্পেয়ে ঝরে জলের ধারা
বলেন বাবু ‘হা, বিপ্লবের সব মাটি সাহারা’
কুমীর কাঁদতে থাকে
কুমীর কাঁদতে থাকে ‘আয় আমাকে নামা নামা ব’লে
কিন্তু বাপু আর যাব না চরাতে-জঙ্গলে
আমরা ঢের বুঝেছি
আমরা ঢের বুঝেছি খেঁদীপেচী নামের এসব আদর
সামনে গেলেই ভরবে মুখে, প্রাণ ভ’রে তাই সাধো
তুমি সে-বন্ধু না
তুমি সে-বন্ধু না, যে ধুপধুনা জ্বলে হাজার চোখে
দেখতে পাবে তাকে, সে কি যেমন তেমন লোকে
তাই সব অমাত্য
তাই। সব অমাত্য পাত্রমিত্র এই বিলাপে খুশী
শুঁড়িখানাই কেবল সত্য, আর তো সবই ভূষি
ছি ছি হায় বেচারা’
ছি ছি হায় বেচারা? শুনুন যাঁরা মস্ত পরিত্রাতা
এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা
হেঁটে দেখতে শিখুন
হেঁটে দেখতে শিখুন ঝরছে কী খুন দিনের রাতের মাথায়
আরেকটা কলকাতায় সাহেব আরেকটা কলকাতায়
সাহেব বাবুমশয়।

ছাড়পত্র – সুকান্ত ভট্টাচার্য

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুমঃ
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।
খর্বদেহ নিঃসহায়,
তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তোলিত,
উদ্ভাসিত কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।
সে ভাষা বোঝে না কেউ,
কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।
আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা।
পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের
পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর
অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,
তারপর হব ইতিহাস

আমরা এসেছি – সুকান্ত ভট্টাচার্য

কারা যেন আজ দুহাতে খুলেছে, ভেঙেছে খিল,
মিছিলে আমরা নিমগ্ন তাই, দোলে মিছিল।
দু:খ-যুগের ধারায় ধারায়
যারা আনে প্রাণ, যারা তা হারায়
তারাই ভরিয়ে তুলেছে সাড়ায় হৃদয়-বিল।
তারাই এসেছে মিছিলে, আজকে চলে মিছিল।।
কে যেন ক্ষুব্ধ ভোমরার চাকে ছুঁড়েছে ঢিল,
তাইতো দগ্ধ, ভগ্ন, পুরনো পথ বাতিল।
আশ্বিন থেকে বৈশাখে যারা
হাওয়ার মতন ছুটে দিশেহারা,
হাতের স্পর্শে কাজ হয় সারা, কাঁপে নিখিল।
তারা এল আজ দুর্বারগতি চলে মিছিল।।
আজকে হালকা হাওয়ায় উড়ুক একক চিল,
জনতরঙ্গে আমরা ক্ষিপ্ত ঢেউ ফেনিল।
উধাও আলোর নিচে সমারোহ,
মিলিত প্রানের একী বিদ্রোহ!
ফিরে তাকানোর নেই ভীরু মোহ, কী গতশীল!
সবাই এসেছে, তুমি আসোনিকো, ডাকে মিছিল।।
একটি কথায় ব্যক্ত চেতনা : আকাশে নীল,
দৃষ্টি সেখানে তাইতো পদধ্বনিতে মিল।
সামনে মৃত্যুকবলিত দ্বার,
থাক অরণ্য, থাক না পাহাড়,
ব্যর্থ নোঙর, নদী হব পার, খুঁটি শিথিল।
আমরা এসেছি মিছিলে, গর্জে ওঠে মিছিল।।

মা – কল্লোল সোম

তুমি বলো মা,
চোখ দেখেই কি
চেনা যায়
ধুরন্ধর দেবতা… মানুষ,
মানুষেরই মতো
পাথর মূর্তি;

চোখ, আমাদের চোখ, কেমন
অন্ধকারকে চোখে চোখ রেখে দেখে, মা?
না কি
সবই ফুসলানো, লোভ-ক্ষোভ খেলা
ধাড়ী-পেড়ে-ফেলা আলো্র ফিনকি?
প্রদীপ্ত হওয়ার নির্দেশ – সে যে
ছিল;
থাকেই যেমন… আদিম মঠ থেকে
কুয়াশা-ধ্বণি, নীলিমা থেকে
স্পষ্টতাবিলোপ,
প্রবাহের নির্বাণ।
একই
কোটরে – সাপ, পাখি, পাখি-মা…
বেহেড গোবদা সহকাল
গোবরে কুত্তায় লালায়
সবই লেপে
হেঁটে গ্যালো
এক সপ্রতিভ ওরাং ওটাং …
নীল-সাদা-লাল সক্ষমতা পিঁজে পিঁজে,
সকালের সুকুমার মাড়িয়ে —
তার চোখ কি
তোমার অদ্বিতীয় পুরুষের
মা –?

গোপন প্রিয়া – কাজী নজরুল ইসলাম

পাইনি ব’লে আজো তোমায় বাসছি ভালো, রাণি,
মধ্যে সাগর, এ-পার ও-পার করছি কানাকানি!
আমি এ-পার, তুমি ও-পার,
মধ্যে কাঁদে বাধার পাথার
ও-পার হ’তে ছায়া-তরু দাও তুমি হাত্‌ছানি,
আমি মরু, পাইনে তোমার ছায়ার ছোঁওয়াখানি।
নাম-শোনা দুই বন্ধু মোরা, হয়নি পরিচয়!
আমার বুকে কাঁদছে আশা, তোমার বুকে ভয়!
এই-পারী ঢেউ বাদল-বায়ে
আছড়ে পড়ে তোমার পায়ে,
আমার ঢেউ-এর দোলায় তোমার ক’রলো না কূল ক্ষয়,
কূল ভেঙেছে আমার ধারে-তোমার ধারে নয়!
চেনার বন্ধু, পেলাম না ক’ জানার অবসর।
গানের পাখী ব’সেছিলাম দু’দিন শাখার’ পর।
গান ফুরালো যাব যবে
গানের কথাই মনে রবে,
পাখী তখন থাকবো না ক’-থাকবে পাখীর ঘর,
উড়ব আমি,-কাঁদবে তুমি ব্যথার বালুচর!
তোমার পারে বাজল কখন আমার পারের ঢেউ,
অজানিতা! কেউ জানে না, জানবে না ক’ কেউ।
উড়তে গিয়ে পাখা হ’তে
একটি পালক প’ড়লে পথে
ভুলে’ প্রিয় তুলে যেন খোঁপায় গুঁজে নেও!
ভয় কি সখি? আপনি তুমি ফেলবে খুলে এ-ও!
বর্ষা-ঝরা এমনি প্রাতে আমার মত কি
ঝুরবে তুমি একলা মনে, বনের কেতকী?
মনের মনে নিশীথ-রাতে
চুমু দেবে কি কল্পনাতে?
স্বপ্ন দেখে উঠবে জেগে, ভাববে কত কি!
মেঘের সাথে কাঁদবে তুমি, আমার চাতকী!
দূরের প্রিয়া! পাইনি তোমায় তাই এ কাঁদন-রোল!
কূল মেলে না,-তাই দরিয়ায় উঠতেছে ঢেউ-দোল!
তোমায় পেলে থামত বাঁশী,
আসত মরণ সর্বনাশী।
পাইনি ক’ তাই ভ’রে আছে আমার বুকের কোল।
বেণুর হিয়া শূন্য ব’লে উঠবে বাঁশীর বোল।
বন্ধু, তুমি হাতের-কাছের সাথের-সাথী নও,
দূরে যত রও এ হিয়ার তত নিকট হও।
থাকবে তুমি ছায়ার সাথে
মায়ার মত চাঁদনী রাতে!
যত গোপন তত মধুর-নাই বা কথা কও!
শয়ন-সাথে রও না তুমি নয়ন-পাতে রও!
ওগো আমার আড়াল-থাকা ওগো স্বপন-চোর!
তুমি আছ আমি আছি এই তো খুশি মোর।
কোথায় আছ কেমনে রাণি
কাজ কি খোঁজে, নাই বা জানি!
ভালোবাসি এই আনন্দে আপনি আছি ভোর!
চাই না জাগা, থাকুক চোখে এমনি ঘুমের ঘোর!
রাত্রে যখন এক্‌লা শোব-চাইবে তোমার বুক,
নিবিড়-ঘন হবে যখন একলা থাকার দুখ,
দুখের সুরায় মস্ত্‌ হ’য়ে
থাকবে এ-প্রাণ তোমায় ল’য়ে,
কল্পনাতে আঁকব তোমার চাঁদ-চুয়ানো মুখ!
ঘুমে জাগায় জড়িয়ে র’বে, সেই তো চরম সুখ!
গাইব আমি, দূরের থেকে শুনবে তুমি গান।
থামবে আমি-গান গাওয়াবে তোমার অভিমান!
শিল্পী আমি, আমি কবি,
তুমি আমার আঁকা ছবি,
আমার লেখা কাব্য তুমি, আমার রচা গান।
চাইব না ক’, পরান ভ’রে ক’রে যাব দান।
তোমার বুকে স্থান কোথা গো এ দূর-বিরহীর,
কাজ কি জেনে?- তল কেবা পায় অতল জলধির।
গোপন তুমি আসলে নেমে
কাব্যে আমার, আমার প্রেমে,
এই-সে সুখে থাকবে বেঁচে, কাজ কি দেখে তীর?
দূরের পাখী-গান গেয়ে যাই, না-ই বাঁধিলাম নীড়!
বিদায় যেদিন নেবো সেদিন নাই-বা পেলাম দান,
মনে আমায় ক’রবে না ক’-সেই তো মনে স্থান!
যে-দিন আমায় ভুলতে গিয়ে
করবে মনে, সে-দিন প্রিয়ে
ভোলার মাঝে উঠবে বেঁচে, সেই তো আমার প্রাণ!
নাই বা পেলাম, চেয়ে গেলাম, গেলে গেলাম গান!

লিচু চোর – কাজী নজরুল ইসলাম

বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,
ও বাবা মড়াত করে
পড়েছি সরাত জোরে।
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই।
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।
আমিও বাগিয়ে থাপড়
দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
ও বাবা শেয়াল কোথা
ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা
দেখে যেই আঁতকে ওঠা
কুকুরও জাড়লে ছোটা!
আমি কই কম্ম কাবার
কুকুরেই করবে সাবাড়!
‘বাবা গো মা গো’ বলে
পাঁচিলের ফোঁকল গলে
ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,
যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!
যাব ফের? কান মলি ভাই,
চুরিতে আর যদি যাই!
তবে মোর নামই মিছা!
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস? ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা!

অভিশাপ – কাজী নজরুল ইসলাম

যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মরু কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোওয়ায় উঠবে ও-বুক ছমকে, –
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদনাতে চোখ বুজবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিড়ে আসবে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই – “সেই যে পথিক, তার শেখানো গান না?”
আসবে ভেঙে কান্না!
প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি
ঘন ঘন মুছবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে-ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ –
কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
চোখের জলে সেদিন বালা
মুখের হাসি ঘুচবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!

বিদায়-বেলায় – কাজী নজরুল ইসলাম

তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না,
জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না।
ঐ কাতর কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না,
শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।।
হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা,
আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ
দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
চলার তোমার বাকী পথটুকু-
পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক-
হায়, অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না,
ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।।
দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি
তব ব্যথা কেউ বোঝে না,
তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী,
পথে ফেরে যারা পথ-হারা,
কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না,
বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি?
দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে?
এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে!
তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায়
কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায়
আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়-
পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক!
কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো
মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না,
ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।।

কুলি-মজুর – কাজী নজরুল ইসলাম

দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,
সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!

আনন্দময়ীর আগমনে – কাজী নজরুল ইসলাম

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।
তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।-
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।..
‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী
কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!

সাম্যবাদী – কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!
বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্‌জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

মানুষ

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘পূজারী, দুয়ার খোলো,
ক্ষুদার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ’ল!’
স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুদায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন!’
সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুদার মানিক জ্বলে!
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্
বলে ‘বাবা, আমি ভুকা-ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা – ‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – ‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুদার অন্ন তা’বলে বন্ধ করনি প্রভু
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
পূজিছে গ্রন’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবা-রাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্‌ উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র’বে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!
তোমারি কামনা-রাণী
যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।

কবি- কাজী নজরুল ইসলাম 

আমার কৈফিয়ৎ

বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,
দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?
বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!
আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।
বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্‌ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্‌ চেয়ে!
ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?
আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!

কবি - – কাজী নজরুল ইসলাম

প্রজন্ম


ইউক্যালিপটাসের সরু দীঘল পাতা পিছলে
সকালের চৈতী রোদ্দুর ছলকে ঝাঁপিয়ে পড়লো
টংঘরের দুয়ারে চিত্রার্পিত ধনবতী রিয়াংএর পেটে।
চার চারটে সুদীর্ঘ দিন রাত নৌকো বেয়ে পার হলো
ফেরেনি মরদ চাল নিয়ে উপরের লুসাই বস্তি থেকে,
পেটে জ্বলছে ধনবতীর জুমের আগুন ধিকিধিকি
সারাদিন সারারাত দমকে দমকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে,
আরেক বিপন্ন নবীন অস্তিত্ব হাত পায়ের সঞ্চালনে
ঘোষণা করেই চলেছে বেরোতে চাই আলোকে,
মোচড়ে মোচড়ে কঁকিয়ে উঠছে নারী বিস্ফারিত চোখ।
তারপর সূর্য যখন প্রখর উত্তপ্ত মাথার উপর —
আদিম জননীর মত ধনবতী রক্তস্রোতে ভাসিয়ে
রক্তাক্ত আবহে একটি শিশু উপহার দিলো
আগামী পৃথিবীর প্রবাহিত জনতার স্রোতে,
কান্নার উতরোলে সে তার আবির্ভাব ঘোষণা করলো,
তার কান্নার চমকে তপ্ত চৈতালি সূর্য উঁকি দিল —
সামনের রক্তিম পলাশ উঁকি দিল., প্রসবের রক্তিম
স্রোতে নিস্পন্দ নিস্প্রাণ জননীর পাশে দেখা গেল
আগামীর রক্তাক্ত ইতিহাস জেহাদে ক্রন্দনে আকুল,
বিষাদে মুখ ফেরালো সূর্য ঝরলো পলাশ গুচ্ছ ।

কবি - সুনীতি দেবনাথ

অতিথি পাখি

অতিথি পাখি
উড়ে এসে
উড়ে চলে যায়
আপন খেয়ালে
এই গল্পে-
কোনো ভালো-বাসা-বাসি নাই
আমরাই ঝরা পালক
কুড়ায়ে লয়ে
ভালোবাসা করি অনুভব
তবে কি
সেও ভালোবাসে
না বাসিলে আবার কেন
উড়ে আসে পরের শীতে
বুঝি না-
তারপরে আবারো
কেন উড়ে চলে যায়
ফটফটে পালক ঝরায়ে...

কবি - মাসুম বাদল

তবুও ষড়ঋতু - সালমা সেঁতারা

বাংলাদেশ-ই পৃথিবীতে একমাত্র ষড়ঋতুর দেশ। আমরা বাংলাদেশীরা আমাদের ঋতুবৈচিত্র নিয়ে কতই না গর্ববোধ করি। এই চিরায়মানা ঋতুর প্রতি আমাদের অনুরাগের শেষ নেই। একেক ঋতু একেক রকম আবহাওয়ার ফুল, ফল, ফসলের সম্ভার নিয়ে আসে বাংলাদেশে।  গৃষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, প্রতিটি ঋতুরি আলাদা মেজাজ আমাদের মানসকে মুগ্ধ করে, ভিত করে, নিঃস্বকরে, আনন্দিত করে আবার পরিপূর্ণও করে দেয়। মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে দান করেছেন এই ঋতু সৌন্দর্য সুষমা, কিন্তু আমরা মানুষরা কখনই তার শোকর বা কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করে উল্টো প্রকৃতির সাথে গাছ কেটে, নদী ভরে অট্রালিকা করে জঙ্গল উচ্ছেদ করে রীতিমত যুদ্ধ করে চলেছি।

                বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষক সোসাইটির চেয়ারম্যান জনাব শরীফুল ইসলাম সাহেব শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতির উন্ননয়ন শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে একটি সুন্দর কথা বললেন ‘আমরা নির্দি¦ধায় সমগ্র বাংলাদেশকে পুড়ে ঢাকা তথা শহরগুলোকে হাই রাইজ করছি’। কথাটি প্রকৃতি নিধনের সাথে সংশি−ষ্ট।

তাই প্রকৃতি রাণীরাও আমাদের সাথে যেন আড়ি নিয়েছে। তাই গ্রীষ্মে ঝড় নেই, হেমন্তে ধান নেই, বর্ষায় বৃষ্টি নেই, শীতে হিমেল নেই, বসন্তে ফুল নেই, শরতে শিশির নেই। যেমন বৈশাখে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু। ফসলের মধ্যে ইতি ধানের নবান্ন। অর্থাত আউশের প্রান্তিক। বর্ষায় পাট প্রধান ফসল, ফলের মধ্যে পেয়ারা লটকো, লেবু, আনারস প্রভৃতি। আবার শরতে উৎপাদিত উলে−খযোগ্য ফসল নেই। তবে প্রকৃতিটা যেন সুফলার আসন্ন ঋতুবতী। ফলের মধ্যে শরতের প্রধান ফল জাম্বুরা, অর্থাত বাতাবী লেবু। বাংগালী মনের সবচেয়ে প্রিয় ফুলগুলি এই ঋৃতুকে সৌন্দর্য ভালবাসা মন্ডিত করেছে। যেমন শিউলী, শাপলা ও পদ্ম। এই ফুলগুলির সাথে বাংলাদেশীদের লোকজ সংস্কৃতি অনেক গান প্রেম গাথা গল্প কথা জড়িয়ে আছে আবহমানকাল থেকে। আমরা আর্টিফিসিয়াল যত ফুল-ই দেখিনা কেন? নিজের ঘরে যত যতেœই সাজাই না কেন? তবু শাপলা ভরা বিল, তার মাঝে মাঝে মাথা ইষৎ উঁচু করে অভিবাদনের ভঙ্গীতে ফুটে থাকা শ্বেত পদ্ম, শিউলীর কোমল শুভ্রতা, আল পথে বিলের বাঁকে হিজল তলায় ঝরা হিজল ফুলের, গোলাপী মখমল। এসব দৃষ্টি নন্দন পুষ্পিত চিত্র আমাদের ভীষণভাবে আনন্দ দান করে। তাইতো মনের আনন্দে কন্ঠে সুরের ঢেউ খেলে যায়। মহান দাতার দানের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে গাইতে ইচ্ছে করে, সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি, খোদা----- তোমার মেহেরবাণী। আল্লাহপাক আনন্দ অনুভূতি ভাষা সুর, সুরের সাতটি  স্তর দেখার দৃষ্টি মানুষকে দান করেছেন।  নিঃসর্গ তাকে পলে পলে জাগিয়ে তোলে। সুরে ও কাব্যে প্রকাশ ঘটে তার। বাঙালী বা বাংলাদেশী মাত্রই কী চাষী, কি মজুর, কি ধনি, কি ধ্যানি সকলেই মনের একান্তে কবি ও গায়ক। শুধু দারিদ্র সীমার নিচে থেকে টানা পোড়েনের নাভীশ্বাসে দৈনন্দিন কাটে, তাই ভাব সুর, কাব্য কবিতা সব কিছুই যেন অসহায় মনের নিভৃত কোনে আহত বলাকার মত পাখা ঝাপটিয়ে মরে।  তবু এ শরতের শিউলী ফোটা ভোর দু’ছত্র কবিতা লিখায়। দু’কলি গানের গঞ্জন তোলে বাঙালীর স¦ভাব সুরের কন্ঠে। ইচ্ছে করে শাল পাতায় সদ্য ফোটা ভোরের শিশির সিক্ত শিউলী এনে অর্ঘ্য রচনা করি কোন সুদূরের প্রিয়তম লাগি।

                শরত প্রায় শেষ হয়ে এলো, আর দুদিন পরেই হেমন্ত, তবে এই শরতেই বাংলাদেশের  প্রাকৃত সোনালী ফসল আমন চারা রোপন করা শেষ হয়। সদ্য লাগানো ধানের চারা প্রথমে লাল হয়ে যায়। কৃষকরা প্রতিদিন দুবেলা যত্নেনেয়। শরতের কোমল রোদ ও জলীয়বাষ্প ভরা বাতাস ধীরে ধীরে চারাগুলিকে নিবীড় ঘন সবুজ করে তোলে। চাষী ভাইরা তখন চিন্তামুক্ত হয় ধান লেগে গেল বলে। বর্ষা কেটে যাবার রেশ হিসেবে মাঝে মাঝে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ধানের চারাগুলিকে শতগুচ্ছ করে তোলে।

                বর্ষায় খালে বিলে আটকে পড়া বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ এই শরতে প্রচুর ধরা পড়ে। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাদের উদ্ভাবিত ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে ধরে। আবার এই শরতেই পুকুরে মাছচাষীরা নতুন করে রেণুপোনা ছাড়ে। এসব মাছ ফাল্গুন চত্রি মাসে বড় হয়ে যায়। শীতের শেষের মাছ তুলনামূলকভাবে বর্ষার মাছের চেয়ে সুস¦াদু।

                 ষড় ঋতু এই কথাটি উচ্চারণের সাথে সাথেই মনোমুগ্ধকর কিছু প্রাকৃতিক চিত্র চোখে ভেষে ওঠে। আল্লাহপাক এক এক ভুখন্ডের মানুষের মন মেজাজ এবং প্রকৃতি বিচার করেই যেন তাদের, আবাস ভুমির জল হাওয়া ও পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। তবে বৎসরে ছয়টি বিচিত্র রূপের ঋতু বা মৌসুম, এমন সুষমা মাধুর্যে ভরে একমাত্র বাংলাকেই দান করেছেন।  এদিক থেকে বাংলাদেশ ধন্য।

                আল্লাহ বলেছেন, “আমার সৃজিত যা কিছু সুন্দর  আছে, আমার বান্দারা যদি তা অবলোকন করে মুগ্ধ হয়ে বলে, “সমস্ত প্রশংসা তোমার জন্য” তাহলে তার উপর আমি খুশি হয়ে আমার রহমত বর্ষণ করি। আর বান্দার মনকে প্রশান্তিতে ভরে রাখি। যে প্রকৃতিকে ভালবাসবে সে সন্ত্রাসী জিঘাংসা প্রিয় হতে পারে না।  প্রকৃতির সৌন্দর্য তার মনে অবশ্যই কোমলতা আনবে এবং চিত্তকে দয়ার্দ্র করে দেবে।

                কিন্তু কষ্টের বিষয় আমরা শুধু প্রকৃতিকে উপভোগ করতে জানি, দেখে দেখে দৃষ্টিতে মুগ্ধতা আনি, কিন্তু প্রকৃতিকে লালন করি না। প্রয়োজনের দাবানলে গাছ কেটে, মাছ মেরে, ফুল ছিড়েঁ ঘর তুলে, ষড় ঋতুর সৌন্দর্য ছড়াবার আধারগুলিকে জ্বালিয়ে দিয়েছি।

                হিন্দু বিশ্বাসে প্রকৃতি দেবীতুল্যা। হিন্দু সম্প্রদায় প্রকৃতিকে অনেক ভক্তি অর্ঘ্য দিয়ে থাকেন। তাদের বিশ্বাসে কৃষ্ণই প্রকৃতি, আবার প্রকৃতিই কৃষ্ণ। আমরা মুসলিম সম্প্রদায় প্রকৃতির কোন ক্ষমতায় বিশ্বাসী নই। আমাদের ধর্ম বিশ্বাসে প্রকৃতির যা কিছু সুন্দর এবং ঐশ্বর্য সবই আল্লাহপাকের দান। প্রকৃতির কোন ক্ষমতা নেই। প্রকৃতির ক্ষমতায় বিশ্বাসী হলে ‘শেরেক অর্থাৎ অংশীবাদ’ এর মতো পাপ করবো। দুদিকে দুবিশ্বাস থাকলেও, ভাল লাগা এবং প্রশান্তি একই মানব মনের অনুভব এবং প্রকাশ। তাই ভাল লাগাটা কারও ভিন্ন হতে পারে না। মুগ্ধতা সবার হƒদয়ের অধিকার। উচ্ছাস বা প্রেমের রূপ একই মানব মনন থেকে উৎসারিত।

                ভারতেশ্বরী ইন্দীরা দেবী স¦ীয় পুত্র রাজীব গান্ধীকে ছোট বেলায় নাকি বলতেন যখন তোমার মনে দুঃখ আসবে, কিংবা কোন অস্থিরতা তোমাকে তাড়া করবে, তখন তুমি নিশ্চুপ হয়ে প্রকৃতির কোন এক সৌন্দর্যের প্রতি তাকিয়ে থাকবে। তাহলে দেখবে তোমার মন এক অনাবিল আনন্দে ভরে গিয়েছে। কথাটা অত্যন্ত সত্যি। যেমন ধরুন শরৎ, শরৎ রাতের অভ্রমাখা চাঁদের আলো, কোন মানব মানবীর নীবিড় প্রেমকে জাগিয়ে তোলে না? ভাল লাগা কোনো গানের কলি, কন্ঠে সুর হয়ে বেরিয়ে আসে না; এমন লোক মনে হয় খুঁজে পাওয়া ভার। সন্ধাকালীন মিষ্টি আঁধারে গাইবে কোনো অপেক্ষমানা, এখনি উঠিবে চাঁদ আধো আলো আধো ছায়াতে---------। শরতের দুটি বিখ্যাত ফুল শিউলী ও পদ্ম। বাংলা সাহিত্যে এমন কোন কবি সাহিত্যিক নেই যে তার সাহিত্যকে মধুর করে তোলেনি শরতের শিউলী ফুলকে উপমা করে। এক সময় যখন আউস ধানের পালিত এর উপর গ্রামের মানুষ নির্ভর করতো কিন্তু তার ফলন ছিলো ভীষণ অপ্রতুল। যারা ছোট চাষী সামান্য কিছু ধানি জমি আছে, তারা আমন মৌসুম ধরতে পারত না। আর ভুমিহীনরা তো মোটে খেতেই পেতনা। তখন কাউন চিনা বাজরা এসব কিছু ফাক সময়টাতে মানুষ ভাতের বদলে খেত। সেটা বড় গৃহস্থদের ঘরে-ই থাকতো। ভাদ্র আশ্বিন ও কার্তিক এই প্রান্তিকটা ছিল ভীষণ অভাবের কাল। আমাদের দেশে ইরিগেশন হবার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ৭০ এর দশক পর্যন্ত। অতপর যুদ্ধোত্তর ৭৪ পর্যন্ত বাংলার গ্রামীণ জীবন খাদ্য পুষ্টি ও সর্বোপরি আউশের মৌসুম বনজ ও রবি শষ্য নির্ভর ছিলো। গরীবরা বিলের মাছ শাপলা বনজ শাকসব্জি লতা পাতা খেয়ে জীবন ধারন করতো। যেমন- কচু শাক লতা ছড়া সেটে আলু থানকুনি শাক মেঠো শাক বন পুঁই ঢেকি শাক হেলেঞ্চা কলমী এসব খেতো। আর এতে করে মানুষের কলেরা (ওলা ওঠা) লেগেই থাকতো। বিগত তিন দশক ধরে ইরি আউশ মৌসুমে ইরি প্রচুর পরিমাণ ফলন হওয়াতে মানুষ খেয়ে পরে বাঁচতে পারছে।

                আবার হেমন্তকালে আমন আসে। শীত ও হেমন্ত কেটে যায় বাংলার গ্রামীণ মানুষের মোটামুটি ডাল ভাত মাছ তরকারী খেয়েপরে এক প্রকার সুখে। শহুরে মানুষের কোন মৌসুমের বালাই নেই। সেখানে শীত গ্রীষ্ম শরৎ হেমন্ত বসন্ত সব এক রকম। সেখানে ভোক্তারা এসবের ধার ধারে না। এসব উৎকন্ঠা ব্যবসায়ীরাই সামলে থাকে। এ জন্যই প্রবাদ বলে যদি পড়ে কহর/তবু না ছাড়ি শহর।

                আবার ফাল্গুন চত্রি মাস বসন্তকাল। এই সময়টাও একটা ফসলের ফাক সময়।  এই সময়ও মানুষ পুনরায় অভাব কবলিত, বসন্ত খরার মৌসুম। এই  সময়  প্রকৃতিও  ভীষণ  অফলা  বলে বনজ
কিছু নেই। নদী সোঁথাগুলো শুকিয়ে যায়। তখন একটা জিনিষ শুকিয়ে যাওয়া নদীতে পাওয়া যায় তা হচ্চে শালুক ও পদ্ধের বীজ। এসব পুড়িয়ে রান্না করতো আগে। বিশেষ করে বনকচুর ছড়া খুবই উপাদেয়। এসব গৃহস্থরাও গরীবদের নিকট চালের বিনিময়ে টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করে সখ করে রান্না করে খেতো। এর ফলেই বীজ ধ্বংস হয়ে শাপলা পদ্ম কচু দিন দিন বিলুপ্তির পথে।

এখন আবার দেখা যাচ্ছে শাপলা ও পদ্ম ফুল শহরে কেউ কেউ তুলে এনে বিক্রি করছে। কিন্তু এই ফুল দুটি জলজ ফুল হওয়াতে  এটা দিয়ে গাড়ী বা তোরণ সাজানো যায় না। কারণ এর সজীবতা ভীষণ ক্ষণস্থায়ী। এভাবে যদি বিল থেকে উজাড় করে শাপলা পদ্ম তুলে আনা হয় তাহলে এক সময় প্রকৃতির কোল থেকে এ ফুলও হারিয়ে যাবে।

                পৌরানিককালের গল্প, কোন যুবক, রাজ কন্যার প্রেমে পড়লে, প্রেমের অভিপ্রায় পূর্ণ হবার মানষে ঋষীর স্মরনাপন্ন হলে, ঋষী বলতেন “হে বৎস, একশো একটা নীল পদ্ম যদি দেবতার পায়ে অর্ঘ্য দিতে পার তবেই প্রেমে জয়ী হবে”। আসলে কি নীল পদ্ম ছিলো? নাকি প্রেমের অর্ঘ্য দিতেই নীল পদ্ম বিলুপ্ত হয়ে গেছে? আসলে কথাটার অর্থ মনে হয় অসাধ্যকে সাধন করা। নীল পদ্ম বলে কিছু ছিল না। তবে আমরা এই তিন দশক আগেও বিলে শ্বেত পদ্ম দেখেছি, এখন আর নেই বললেই চলে। অবশিষ্ট রইলো গোলাপী পদ্ম। তবে এখন বিরল হয়ে যাচ্ছে ক্ষুধার অর্ঘ্য দিতে গিয়ে।

                বাষ্পায়িত বিলের পানি শিশির হয়ে শিউলী আঘ্রান করার জন্য বাড়ীর আঙ্গিনায় আসতো। এখন বিভিন্ন কারণে শিউলীর স্থান বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে সড়ক দ্বীপে হয়েছে। তাই শিশিরের প্রেমভারে সদ্য ফোটা শিউলী আর লুটিয়ে পড়ে না আঙিনায়।

                ধীরে ধীরে শ্রষ্ঠার দান এ সুন্দর প্রকৃতি আমাদের চারিপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, আমাদেরি নিধন যজ্ঞে। আসুন আমরা সকলে মিলে আল্লাহপাকের দান এই প্রকৃতির ঐশ্বর্ষকে আমাদেরি প্রশান্তির স্বার্থে লালন করি।

ষড় ঋতুর প্রত্যেক ঋতুই আমাদের জন্য বিধাতার আশীর্বাদ স¦রূপ। জন্ম আমার ধন্য হলো মা----গো---- এমন করে আকুল হয়ে আমা---য় তুমি ডাকো। সত্যি আমাদের দেশের এই ঋতু বৈচিত্র অন্তর মন মন্থন করে আনন্দ অশ্র“ ঝরায় আর সে অশ্র“ই যেন ঘাসে ঘাসে পদ্ম পাতায় টলমল শিশির হয়ে খেলা করে। অনন্য হে শ্রষ্ঠা তুমি আমাদের দান করেছো এতো সুন্দর প্রকৃতি। সেটাকে লালন করার জন্য আমাদেরকে তুমি ক্ষমতা দাও।

যাতায়াত



 কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো ।

 কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
 রাত কাটে তো ভোর দেখি না
 কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না; কেউ জানেনা ।

 নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম
 পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক
 দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,
 কেউ বলেনি ভালো থেকো। সুখেই থেকো!
 যুগল চোখে জলের ভাষায়, আসার সময় কেউ বলেনি
 মাথার কসম আবার এসো ।

 জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো
 শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,
 চৈত্রাগুণে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি
 বললো না কেউ; তরুণ তাপস, এই নে চারু শীতল কলস ।

 লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম ।

 ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়
 আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই
 দুঃসময়ে এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন ।
 কেউ ডাকেনি তবু এলাম,
 বলতে এলাম-
 ভালোবাসি!

কবি - হেলাল হাফিজ

চিঠি দিও

করুণা করে হলেও চিঠি দিও,
 খামে ভরে তুলে দিও আঙ্গুলের মিহিন সেলাই
 ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
 এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও,
 তোমার শাড়ির মতো
 অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।

 চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও ...
 বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!

 আজও তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,
 আসবেন অচেনা রাজার লোক
 তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে ....
 এমন ব্যস্ততা যদি
 শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল! ...

 করুণা করে হলেও চিঠি দিও,
 ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি দিও খামে
 কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস
 একটি ফুলের ছোট নাম,
 টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে
 কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে
 সেইসব চুপচাপ কোন দুপুরবেলার গল্প
 খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে, তাই লিখো

 করুণা করে হলেও চিঠি দিও, মিথ্যে করে হলেও বোলো, ভালবাসি !

কবি - মহাদেব সাহা

পরিচয়

একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে
 বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে,
 তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি
 'পরিচয় কোনো আছে নাকি,
 যাবে কোনখানে'?
 আমি শুধু বলেছি,'কে জানে'!

 নদীতে লাগিল দোলা,বাধঁনে পড়িল টান-
 একা,বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।
 সেই গান শুনি
 কুসুমিত তরুতলে তরুণ-তরুণী
 তুলিল অশোক-
 মোর হাতে দিয়া কহিল,'এ আমাদেরই লোক'।
 আর কিছু নয়।
 সে মোর প্রথম পরিচয়।

 তার পরে জোয়ারের বেলা
 সাঙ্গ হল, সাঙ্গ হল জোয়ারের খেলা;
 কোকিলের ক্লান্ত গানে
 বিস্মৃত দিনের কথা অকস্মাৎ যেন মনে আনে;
 কনক চাপার দল পড়ে ঝুরে,
 ভেসে যায় দূরে,
 ফাল্গুণের উৎসবরাতির
 নিমন্ত্রণলিখনপাঁতির
 ছিন্ন অংশ তারা
 অর্থহারা।।

 ভাঁটার গভীর টানে
 তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে।
 নূতন কালের নবযাত্রী ছেলেমেয়ে
 শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,
 'সন্ধ্যার তারার দিকে
 বহিয়া চলেছে তরণী কে?'
 সেতারেতে বাঁধিলাম তার,
 গাহিলাম আরবার,
 'মোর নাম এই'বলে খ্যাত হোক,
 আমি তোমাদেরই লোক,
 আর কিছু নয়-
 এই হোক শেষ পরিচয়।

কবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেজাজ

থলির ভেতর হাত ঢেকে
 শাশুড়ি বিড় বিড় ক'রে মালা জপছেন;
 বউ
 গটগট করে হেটে গেল।
 আওয়াজটা বেয়াড়া ; রোজকার আটপৌরে নয়।
 যেন বাড়িতে ফেরিওয়ালা ডেকে
 শখ করে নতুন কেনা হয়েছে।


 সুতরাং
 মালাটা থেমে গেল ; এবং
 চোখ দুটো বিষ হয়ে
 ঘাড়টাকে হেলিয়ে দিয়ে যেদিকে বউ যাচ্ছিল
 সেইদিকে ঢ'লে পড়ল।
 নিচের চোয়ালটা সামনে ঠেলে
 দাঁতে দাঁত লাগল।

 বিলক্ষণ রাগ দেখিয়ে
 পরমুহূর্তেই শাশুড়ির দাঁত চোখ ঘাড় চোয়াল
 যে যার জায়গায় ফিরে এল।
 তারপর সারা বাড়িটাকে আঁচড়ে-আঁচড়ে
 কলতলায়
 ঝমর ঝম খনর খন ক্যাঁচ ঘ্যাঁষঘিঁষ ক্যাঁচর ক্যাঁচর
 শব্দ উঠল।
 বাসনগুলো কোনদিন তো এত ঝঁঝ দেখায় না -
 বড় তেল হয়েছে।

 ঘুরতে ঘুরতে মালাটা দাঁড়িয়ে পড়ল।
 নোড়া দিয়ে মুখ ভেঙ্গে দিতে হয় -
 মালাটা একবার ঝাঁকুনি খেয়ে
 আবার চলতে লাগল।
 নাকে অস্ফুট শব্দ ক'রে
 থলির ভেতর পাঁচটা আঙ্গুল হঠাত
 মালাটার গলা চেপে ধরল।
 মি্নসের আক্কেলেরও বলিহারি !
 কোত্থেকে এক কালো অলক্ষুণে
 পায়ে খুরঅলা ধিঙ্গি মেয়ে ধ'রে এনে
 ছেলেটার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেল।
 কেন ? বাংলাদেশে ফরসা মেয়ে ছিলনা ?
 বাপ অবশ্য দিয়েছিওল থুয়েছিল -
 হ্যাঁ দিয়েছিল !
 গলায় রসুড়ি দিয়ে আদায় করা হয়েছিল না ?

 এবার মালাটাকে দয়া ক'রে ছেড়ে দেয়া হল।
 শাশুড়ির মুখ দেখে মনে হচ্ছিল
 থলির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে এইসময়ে
 কী যেন তিনি লুকোচ্ছিলেন।
 একটা জিনিস -
 ক'মাস আগে বউমা
 মরবার জন্যে বিষ খেয়েছিল।
 ভাশুরপো ডাক্তার না হলে
 ও-বউ এ-বংশের গায়ে ঠিক চুনকালি মাখাত।
 কেন ? অসুখ ক'রে মরলে কি হয় ?
 ঢঙ্গী আর বলেছে কাকে !

 হাতে একরাশ ময়লা কপড় নিয়ে
 কালো বউ
 গটগট গটগট ক'রে সামনে দিয়ে চলে গেল।
 নাঃ আর বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়।
 'বউমা - '
 'বলুন।'
 উঁহু, গলার স্বরটা ঠিক কাছা-গলায়-দেওয়ার মত নয়
 বড্ড ন্যাড়া।
 হঠাত এই দেমাগ এল কোত্থেকে ?
 বাপের বাড়ির কেউ তো
 ভাইফোঁটার পর আর এদিক মাড়ায় নি ?

 বাড়িটা যেন ঝড়ের অপেক্ষায়
 থমথম করছে।
 ছোট ছেলে কলেজে ;
 মেজোটি সামনের বাড়ির রোয়াকে ব'সে
 রাস্তায় মেয়ে দেখছে ;
 ফরসা ফরসা মেয়ে -
 বউদির মত ভুশুন্ডি কালো নয়।
 বালতি ঠনঠনিয়ে
 বউ যেন মা-কালীর মত রণরঙিণী বেশে
 কোমড়ে আঁচল জড়িয়ে
 চোখে চোখ রেখে শাশুড়ির সামনে দাঁড়ালো।

 শাশুড়ির কেমন যেন
 হঠাত গা ছমছম করতে লাগল।
 তাড়াতাড়ি থলের মধ্যে হাতটা লুকিয়ে ফেলে
 চোখ নামিয়ে বললেন: আচ্ছা থাক, এখন যাও।
 বউ মাথা উঁচু ক'রে
 গটগট ক'রে চলে গেল !

 তারপর একা একা পা ছড়িয়ে ব'সে
 মোটা চশমায় কাঁথা সেলাই করতে করতে
 শাশুড়ি এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় হয়ে ভাবতে লাগলেন
 বউ হঠাত কেন বিগড়ে গেল
 তার একটা অন্তত তদন্ত হওয়া দরকার।

 তারপর দরজা দেবার পর
 রাত্রে
 বড় ছেলের ঘরে আড়ি পেতে
 এই এই কথা কানে এল -

 বউ বলছে : 'একটা সুখবর আছে।'
 পরের কথাগুলো এত আস্তে যে শোনা গেল না।
 খানিক পরে চকাস চকাস শব্দ,
 মা হয়ে আর দাঁড়াতে লজ্জা করছিল।
 কিন্তু তদন্তটা শেষ হওয়া দরকার -
 বউয়ের গলা ; মা কান খাড়া করলেন।
 বলছে : 'দেখো, ঠিক আমার মত কালো হবে।'
 এরপর একটা ঠাস করে শব্দ হওয়া উচিত।
 ওমা, বউমা বেশ ডগমগ হয়ে বলছে :
 'কী নাম দেব, জানো ?
 আফ্রিকা।
 কালো মানুষেরা কী কান্ডই না করছে সেখানে।'

কবি - সুভাষ মূখোপাধ্যায়

সেই গল্পটা

আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি
 শোন,পাহাড়টা, আগেই বলেছি ভালোবেসেছিল মেঘকে
 আর মেঘ কিভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে
 বানিয়ে ফেলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকড়া।
 সে তো আগেই শুনেছো
 সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন
 পাহাড় মেঘকে বলল, আজ তুমি লাল শাড়ি পড়ে আসবে
 মেঘ পাহাড়কে বলল, আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেব চন্দন জলে
 ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরোম নদী
 পুরুষরা জ্বলন্ত কাঠ।
 সেইভাবেই সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে
 পাহাড় ছিল মেঘের ঢেউ জলে
 হঠাৎ আকাশ জুড়ে বেজে উঠল ঝড়ের যত ঝম্ফ
 ঝাকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাইয়ের হুমকিতে ছুটে এল এক ঝাঁক হাওয়া
 মেঘের আঁচলে টান মেরে বলল
 ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে।
 এখনও শেষ হয়নি গল্পটা
 বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়ে হয়ে গেল ঠিকই
 কিন্তু পাহাড়কে সে কোনদিনই ভুলতে পারলো না
 বিশ্বাস না হয়তো চিড়ে দেখতে পারো পাহাড়টার হাড়-পাজর
 ভেতরে থৈ থৈ করছে শত ঝরনার জল।

কবি - পূর্ণেন্দু পত্রী

অনির্বাণ

অনির্বাণ আমার বন্ধু।
 অনির্বাণের সাথে যখন আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল,
 তখন সময়টা ছিল বড় অদ্ভুত!
 আমরা হাইওয়ের উপর দিয়ে, অনেক দূরে একটা অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছি;
 লাল আকাশ, সন্ধ্যে হয়ে আসছে-দুপাশে ফাঁকা মাঠ
 আমরা চা খাব বলে গাড়িটা দাঁড় করিয়েছি
 একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত চায়ের দোকানে;
 এমন সময় দেখতে পেলাম, লাল আকাশকে পেছনে রেখে,
 একটা ছেলে মাঠ পার হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
 আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললঃ 'চিনতে পাচ্ছিস'?
 আমি বললামঃ 'না'।
 ও বলেঃ 'ভালো করে দেখ'।
 আমি সেই চুরি যাওয়া আলোতে ওকে চিনলাম-
 আমার বন্ধু অনির্বাণ।
 আমার চোখের সামনে পুরনো দিনগুলো ছায়াছবির মত ভেসে উঠছে।
 আমি ওকে প্রশ্ন করলামঃ 'অনির্বাণ, তুই এখানে!'
 ও বললোঃ 'তাইতো কথা ছিল বন্ধু। আমাদের তো এখানেই থাকার কথা ছিল।'
 আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।
 আমি খুব বোকার মত ওকে প্রশ্ন করলামঃ 'অনির্বাণ, কি করছিস এখন'?
 ও বললোঃ 'যা কথা ছিল বন্ধু; মানুষের মাঝখানেই আছি'।
 আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। একটা অপরাধ বোধ আমাকে গ্রাস করছে।
 ও বললোঃ 'তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে'।
 আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
 ও জানালার কাছে এসে বললোঃ 'এখন তো তোর নাম হয়ে গেছে-তুই তো বিখ্যাত হয়ে গেছিস! সুখেই আছিস, কি বল?'
 আমার গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে,
 অনির্বাণ আমার জীবন থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে।
 অনির্বাণের শেষ কথা গুলো আজোও আমার কানে আলপিনের মত বেঁধে-
 সুখেই আছিস...
 সুখেই আছিস...

কবি- নচিকেতা চক্রবর্তী

আয়না

হারানো ছড়ানো পাগল খুঁজচে
 ফিরে সে আপন হবে।
 আলোর টুকরো দীপ্তি চোখের;
 ভাঙ্গা-গান-ভাসা গানের কানকে ;
 সেই নাক,যার সুরভি বোধটা
 চামেলি বকুলে গেলো কোথায় ;
 ফিরে- ফিরে চায় তাই
 হায় হায় তার চেতনা-জড়ানো
 কত দিনরাত পিছু ডাকে কেঁদে- কেঁদে ।
 হারানো ছড়ানো পাগল ।

 জানে তার হাড় ধুলোয় উড়বে,
 কিছুই দেহের থাকবে না প্রাণকথা ;
 আরো আরো বুক সবই খ'সে ঝ'রে
 মিশে যায় মেঘে হাওয়ায় জলে ।
 নিভে যাবে মন আরো ।
 এখনই কোথায় লক্ষ ক্ষণের ছবি ?
 হাজার দুপুর, বেগুনি সন্ধ্যা, ভোরে নীল হাওয়া, তামসীর চাঁদ
 খেয়ালী খেলায় পাল তুলে গেছে পার ।
 ফিরিয়ে তবুও রাখবে, বাঁধবে, ঢাকবে,
 সাধবে-ভাবচে পাগল ।
 হারানো ছড়ানো পাগল ।

 হারানো ছড়ানো পাগল একলা
 দাঁড়ালো মাঠের ধারে-
 দূরে বুড়ো বট ঝিমন্ত-জাগা,
 ঝাঁ-ঝাঁ রোদ-লাগা, সবুজ ছন্দে স্থির ।
 একটু হাওয়ার মন্ত্র ।
 দেখচে পাগল প্রকাণ্ড চাকা
 নীল আঁকা বাঁকা দিগন্তের;
 প্রখর যন্ত্রে শুনচে ঝিল্লি বাজনা ।
 উঁচু সূর্যের অপারে শূন্য, সোনায় সাজানো;
 চেনা গ্রাম ঐ ঘোর অচেনার
 বিপুল আবেগ আনলো ।
 ঝনঝন ক'রে সৃষ্টিসুদ্ধ ভাঙচে, গড়চে, চলচে-
 কোথায় তুমুল শব্দ ?
 মাঝখানে তারি হঠাৎ পাগল মুখ দেখে চেনে আয়নায়
 আকাশে তাকিয়ে হাসে ।

 ভরা সন্ধ্যায় চুপ ক'রে ব'সে থাকে
 হারানো ছড়ানো পাগল ।

কবি - অমিয় চক্রবর্তী

অমলকান্তি

অমলকান্তি আমার বন্ধু,
 ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
 রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,
 শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
 এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
 দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

 আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
 অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।
 সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
 ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
 জাম আর জামরুলের পাতায়
 যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

 আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
 অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
 সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
 মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
 চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
 আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

 আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
 অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
 যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
 উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
 অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
 অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
 সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
 ভাবতে-ভাবতে
 যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

কবি - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

কবর

এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
 তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
 এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
 পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
 এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
 সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!
 সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি
 লাঙল লইয়া খেতে ছুটিলাম গাঁয়ের ও পথ ধরি।
 যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত
 এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।
 এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে
 ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।

 বাপের বাড়িতে যাইবার কাল কহিত ধরিয়া পা
 আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।
 শাপলার হাটে তরমুজ বেচি পয়সা করি দেড়ী,
 পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।
 দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
 সন্ধাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!
 হেস না হেস না মোন দাদু, সেই তামাক মাজন পায়ে,
 দাদি যে তোমার কত খুশি হত দেখিতিস যদি চেয়ে!
 নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, এতদিন পরে এলে,
 পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখি জলে।
 আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
 কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালা!
 হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,আয় খোদা! দয়াময়,
 আমার দাদরি তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।

 তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি
 যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।
 শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
 গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।
 এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
 গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
 মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
 আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।

 এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
 কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
 সেই ফালগুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,
 বাজান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।
 ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম বাছা শোও,
 সেই শে শোয়া তার শেষ হবে তাহা কী জানিত কেউ?
 গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,
 তুমি যে কহিলা বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?
 তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,
 সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!

 তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জড়ায়ে ধরি,
 তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিতে সারা দিনমান ভরি।
 গাছের পাতার সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,
 ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
 পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
 চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
 আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
 হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
 গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,
 চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।

 ঊদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,
 কবর দেশের আন্ধারে ঘরে পথ পেয়েছিল খুজি।
 তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,
 হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।
 মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, বাছারে যাই,
 বড় ব্যথা রল, দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;
 দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষ্মী আমার ওরে,
 কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।
 ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গন্ড ভিজায়ে নয়ন জলে,
 কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ ব্যথার ছলে।

 ক্ষণপরে মোর ডাকিয়া কহিল আমার কবর গায়
 স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।
 সেই যে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,
 পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
 জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু ছায়,
 গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
 জোনকি মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
 ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
 হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়;
 বেহেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!
 এখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,
 বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে।
 এত আদরের বুজিরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে,
 হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।
 খবরের পর খবর পাঠাত, দাদু যেন কাল এসে
 দুদিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।
 শ্বশুর তাহার কশাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে
 অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।
 সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,
 কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।
 বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,
 কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ বীণ!
 কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,
 এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে।

 ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেহ ভালো,
 কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।
 বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,
 পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।
 হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়।
 আমার বুজীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়।

 হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু, সাত বছরের মেয়ে,
 রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।
 ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,
 অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!
 ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,
 তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে।
 বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,
 রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।

 একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,
 ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।
 সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে।
 কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।
 আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,
 দাদু! ধর¬ধর¬ বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।
 এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,
 কথা কস নাকো, জাগিয়া উটিবে ঘুম¬ভোলা মোর যাদু।
 আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,

 ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবিরের রাগে,
 অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িত বড় সাধ আজ জাগে।
 মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুরে,
 মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূরে।
 জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।
 ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু ব্যথিত প্রাণ।

কবি- জসীম উদ্দিন

বাঁশি



 কিনু গোয়ালার গলি।
 দোতলা বাড়ির
 লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর
 পথের ধারেই।
 লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
 মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ।
 মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
 সিদ্ধিদাতা গণেশের
 দরজার 'পরে আঁটা।
 আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটি জীব
 এক ভাড়াতেই,
 সেটা টিকটিকি।
 তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,
 নেই তার অন্নের অভাব॥


 বেতন পঁচিশ টাকা,
 সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।
 খেতে পাই দত্তদের বাড়ির ছেলেকে পড়িয়ে।
 শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,
 সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসি,
 আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।
 এঞ্জিনের ধস্ ধস্,
 বাঁশির আওয়াজ,
 যাত্রীর ব্যস্ততা,
 কুলির-হাঁকাহাঁকি।
 সাড়ে-দশ বেজে যায়,
 তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার॥

 ধলেশ্বরী-নদীতীরে পিসিদের গ্রাম---
 তাঁর দেওরের মেয়ে,
 অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।
 লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল---
 সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।
 মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,
 আমি তথৈবচ।

 ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া---
 পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর॥

 বর্ষা ঘনঘোর।
 ট্রামের খরচা বাড়ে,
 মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।
 গলিটার কোণে কোণে
 জমে ওঠে, পচে ওঠে
 আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,
 মাছের কান্‌কা,
 মরা বেড়ালের ছানা
 ছাইপাঁশ আরো কত কী যে।
 ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া
 মাইনের মতো,
 বহু ছিদ্র তার।
 আপিসের সাজ
 গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,
 সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।
 বাদলের কালো ছায়া
 স্যাঁত্‍‌সেঁতে ঘরটাতে ঢুকে
 কলে পড়া জন্তুর মতন
 মূর্ছায় অসাড়!
 দিনরাত, মনে হয়, কোন্ আধমরা
 জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।

 গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু---
 যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,
 বড়ো বড়ো চোখ,
 শৌখিন মেজাজ।
 কর্নেট বাজানো তার শখ।
 মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে
 এ গলির বীভত্‍‌স বাতাসে---
 কখনো গভীর রাতে,
 ভোরবেলা আলো-অন্ধকারে,
 কখনো বৈকালে
 ঝিকিমিকি আলো-ছায়ায়।
 হঠাৎ সন্ধ্যায়
 সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,
 সমস্ত আকাশে বেজে ওঠে
 অনাদি কালের বিরহবেদনা।
 তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে
 এ গলিটা ঘোর মিছে
 দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপের মতো।
 হঠাৎ খবর পাই মনে,
 আকবর বাদশার সঙ্গে
 হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।

 বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে
 ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
 এক বৈকুণ্ঠের দিকে

 এ গান যেখানে সত্য
 অনন্ত গোধুলিলগ্নে
 সেইখানে বহি চলে ধলেশ্বরী,
 তীরে তমালের ঘন ছায়া;
 আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা ক'রে, তার
 পরনে ঢাকাই শাড়ি,
 কপালে সিঁদুর॥

কবি -  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর