যদি চলে যাই - কামরান চৌধুরী

যদি চলে যাই, ভুলেই যাবে কি প্রিয়
কত ভালোবাসা কত কত কথামালা
হাতে হাত রেখে ছুঁয়ে থাকা দিনগুলি
দূরে চলে গেলে, সব ভুলে যাবে নাকি?

তারা ভরা রাতে, জোনাকির সাথে মিশে
পূর্ণিমার রাতে আলোর সাগরে ভেসে
বর্ষা দিনে ভিজে, জানালার পাশে বসে,
শিশিরে আবৃত দূর্বা দুই পায়ে দলেদলে।
বসন্ত বাতাসে মেঠোপথে হেঁটেহেঁটে
সিন্ধু নদী গিরি দেখেছি যে ঘুরে ঘুরে।
সব ভুলে যাবে? চির সখা, প্রিয়তম।
খুঁজে নেবে তুমি, কাউকে আমার সম?

যদি চলে যাই তখনো ফুটবে ফুল
সুগন্ধি বাতাসে এলোমেলো করে চুল।
সূর্য ওঠা ভোরে বাতাসে দোলাবে দুল
কত ভালোবাসি? খুঁজবে নদীর কূল।

যদি চলে যাই তখনো আসবে শীত
উষ্ণ আলিঙ্গনে শোনাবে মধুর গীত?
তখনো হাসবে? উড়ায়ে আঁচল শাড়ি
পায়েতে নুপূর ছন্দ তুলে যাবে বাড়ি?
ভ্রমরা গুঞ্জনে সর্ষে ক্ষেতে যাবে ছুটে
হৃদয়ে বাঁধন কোথায় যাবে রে টুটে।
গাছের ছায়ায় পাখির গানের সুরে
খুঁজে পাবে প্রিয় পথভোলা পথিকেরে।

যদি চলে যাই, ভুলেই যাবে কি প্রিয়
আগামীর পথে, সাথে করে নিয়ে যেয়ো।।।

৩০.০৫.২০২০।। শ্যামলী, ঢাকা।

স্বপ্ন ভেলা - কামরান চৌধুরী

কামরান চৌধুরী
 
আবার কবে আসবে ফিরে, সুখের সেসব দিন
ফিরিয়ে দেবো ভালোবাসার, অনন্ত সুখের ঋণ।

কোভিড এসে সম্পর্ক মাঝে, ধরিয়ে দিল যে চিড়
হঠাৎ আঁকে দূরত্ব রেখা, বিষম মনের তীর।

ছিল মধুর ভালোবাসায়, একান্ত আপন কাছে
আক্রান্ত হবার ভয়েভয়ে, আসে না সে আর পাছে।

রূপালী আকাশে মেঘভেলা নিরবে ভেসেই যায়
বৃষ্টি এসেই মনের ঘরে শত কান্নাতে ভাসায়।

তুমিও সুস্থ আমিও সুস্থ, তবু মন যে মানে না
মৃত্যু আশঙ্কায় বুক কাঁপে, কিছুই ভালো লাগে না।

তোমার সাথে পূর্ণ আকাশ দেখিনি সে কতকাল
তিমির রাত পার হয়ে কি, আসবে নব সকাল?

সীমান্ত দ্বার খুলেই যাবে, মুছে যাবে ভয়-ভীতি
শুনবো কি চির পরিচিত তোমারই কণ্ঠ গীতি?

ফুল বাগানে হারিয়ে যাবো পাখিদের কলরবে
স্পর্শ হাসিতে উতলা মন, বুকের ঘরে ফিরবে।

স্বপ্ন ভেলায় ভেসে দু’জন, নিসর্গ সুখ মাখাবো
বিরহ শেষে মিলন সুখে জীবনটাকে সাজাবো।।

২৭.০৫.২০২০ ।। শ্যামলী, ঢাকা।

আলোক তৃপ্তি - অর্পিতা ঘোষ


 অর্পিতা ঘোষ

রাত আসেনা ঘরে...
পরিযায়ী হয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে
ঠিকানা দেয়নি আমায়
সভ্যতাও নিস্তব্ধ নিথর
শুধু গাছেরা জেগে আছে আমার সাথে
ওদের তো নেই কোনো মনখারাপ
তারার আলো গায়ে মেখে কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার অপেক্ষায়,
ভোর হলেই পাপড়ি দেয় মেলে
সকালে সূর্যের সোনালী হাসির সাথে খেলবে,
পাতারা খুশিতে মাতে, ক্লোরোফিল গায়ে মেখে সতেজ হবে বলে।

আমার নেই কোনো অপেক্ষা
প্রতি রাতে একটা করে তারা খসে পরে,
আটপৌরে জীবন মুক্তির কামনায় নিঃশেষ হবে একদিন,
ধীরে ধীরে মাটি হবো, মাটিতে মিশে
কালক্রমে কোনো উদ্ভিদ জন্ম নেবে আমার বুকে,
মনোহর রূপ নিয়ে পাতা আর ফুলে ফুলে ভরবে
দীপ‍্যমান হয়ে তৃপ্তি পাবো সেদিন
                   পৃথিবীর কাছ থেকে।

           

লেখিকা পরিচিতি:--
অর্পিতা ঘোষের জন্ম নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরে, বসবাস ও করে কৃষ্ণনগরে ।ছোট থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ। স্কুলে পড়াশোনা করার পাশাপাশি লেখার ও ঝোঁক ছিল, ছোট থেকেই গল্প কবিতা লেখে,ও ছোটোদের গল্প  ছড়া লেখে। বিভিন্ন কাব্য গ্রন্থে , বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকাই , মাসিক পত্রিকায় ও দৈনিক খবরের কাগজে অনেক লেখা প্রকাশিত , বাংলাদেশের পত্রিকা ও দৈনিক কাগজে ও লেখা প্রকাশিত ।

পরিহাস - মোঃইবাদুল হাসান (ইবু)


নোনা জলের স্রোতের ধারায়
ভাসিয়ে জীবন ভেলা,
সুখের ধারা হারিয়ে এখন
সঙ্গী স্মৃতির মালা।
জীবন নামের এই যে খেয়া
শুধুই ছুটে চলা,
তীরের খোঁজে বেড়াই ভেসে
কাটিয়ে সারাবেলা।
ব্যথায় ভরা জীবন এখন
ঘুরছি কতকাল,
আর কতদিন রইবো পরে
যন্ত্রণার এই জাল!!
জীবনটা তো এখন শুধু
দুঃখের উপাখ্যান,
বেলা শেষে দাঁড়িয়ে থাকা
সুর হারানো গান।
মেঘে ভাসা জীবন এখন
গল্পে লেখা উপন্যাস,
ঝরে পরা পাপড়ি হওয়া
কেমনতর পরিহাস?
---------------------------

ঈদে আত্মশুদ্ধি - কামরান চৌধুরী

আকাশে বাতাসে আনন্দ কনারা আবির মাখিয়ে যে যায়
রমজান শেষ হলেই, মুমিন হৃদয় খুশিতে হারায়।
আনন্দ বার্তায় ফিরে ফিরে আসে, সে মুসলমানের দ্বারে
অনুগ্রহ নিয়ামত দু’হাতে স্রষ্টা, ভরিয়ে দেন বান্দাকে।

হিংসা-দ্বেষ ভুলে, সাম্য-প্রীতির বন্ধনে কোলাকুলি করে
খুশি মনে সবাই যেন, ভালোবাসার সেতুবন্ধন গড়ে।
ঈদে মুসলিম জাহানে ধনী নির্ধনে নেই খুশির শেষ
বৃদ্ধ শিশু নারী পুরুষের নতুন পোশাকে লাগে যে বেশ।

যদিও পেটে নেই গরিবের দু’বেলা অন্নের সংস্থান
তবুও কেউ দ্যাখে না চেয়ে, তাদের দীন-হীন অবস্থান।
বছর ঘুরে, সিয়াম সাধনা শেষে, ঈদ আসে, ঈদ যায়
কয়লা ধুলে যায় ময়লা? মানব চরিত্রও কি পাল্টায়!

ত্যাগ তিতিক্ষা হয় কি অবসান, রুদ্ধ জানালা মানবের,
আজ খুলে দিই কপাট, মুক্ত বায়ু, মুক্ত আলো প্রবেশের।
বাঁকা চাঁদের হাসি দেখে, চোখে-মুখে তৃপ্ত খুশি মুমিনের
আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে মুছে যাবে মলিনতা জমিনের।

স্বপ্নটাকে ছড়িয়ে দিই, দুঃখের মেঘও সরিয়ে দিই
বুকে টেনে নিই সব মানুষে, খোদার প্রেম বুকেতে নিই;
আজ বিভেদ ভুলে, ঘষে মুছে আত্মাকে করবো ভাই স্বচ্ছ
দেখবে বিশ্ব মুসলিমের আলোকিত সমৃদ্ধ দ্বীপগুচ্ছ।

চলো যাই, সবাই মিলে, একে অন্যের মুখে হাসি ফোটাই।।

শ্যামলী, ঢাকা।।

তোমার বাড়ি যাবো - কামরান চৌধুরী


 
তোমার বাড়ি যাবো বলে বের হয়েছি পথে
কোভিড বলে সাথে যাবো, চড়ে তোমার রথে
দু'পা যেতে তিনপা পিছাই, ভয় যে কাটে না
তোমার কাছে যাবো বন্ধু সময়টা ভালো না।

ভয় শঙ্কা যত্রতত্র মুখোশে ঢাকা শহর
তোমার বাড়ি যাবোই, সাথে ফুলের বহর।
বহুদূর যেতে হবে, পথে নেই কোনো গাড়ি
কেমন করে যাবো বলো বন্ধু তোমার বাড়ি।

চৌদিকে করোনা তাই বাইরে যাওয়া মানা
বসেছি দ্বার বন্ধ করে দেয়না যেন হানা।
তবু তোমায় দেখতে চাই, কি করে যে দেখি
দরজা-জানালা সকলে বন্ধ রেখেছে সেকি?

মনের জানালা খুলেছি, বন্ধু তোমার তরে
পথের বাঁধা নেইতো যাবোই তোমার ঘরে।
বসবো পাশে থাকবো সাথে মধু আলাপন
প্রিয় সাথে কাটবে সময় নেই জ্বালাতন।।

২৩ মে, ২০২০ ।। শ্যামলী, ঢাকা ।।

আম্পান -কামরান চৌধুরী


চলেই গেল আম্পান
কেড়ে নিয়ে কতপ্রান,
থেমে গেল চলাচল
ভেসে গেল নিম্নাঞ্চল। 

ঝড়ো বায়ু ভারি বৃষ্টি
দেশে করে ত্রাস সৃষ্টি।
পড়ে গেলো গাছপালা
লোনা পানি করে খেলা।

করোনার শত ভয়
ক্ষণিকেই শঙ্কা ক্ষয়।
মৌসুমের যত ফল
লুটোপুটি বৃক্ষতল।
নিরাশ্রয় মানুষেরা
ঈশ্বরে প্রার্থনা ঘেরা।
চলেই গেল আম্পান
কেড়ে নিয়ে কতপ্রাণ।
বুকফাটা আর্তনাদ
মুছে দেয় স্বপ্নসাধ।
প্রকৃতির অনাসৃষ্টি
স্থির উদাসীন দৃষ্টি।
শান্ত এখন প্রকৃতি
উদ্ধার ত্রাণের গতি।।

২১ মে, ২০২০।। শ্যামলী, ঢাকা।

আমি ভালো নেই–শাহিনা খাতুন

কবি- শাহিনা খাতুন



চাঁদ সুরুজ আঁকাশ মাটি
আছে সুন্দর হয়ে নতুনের অপেক্ষায়
আমি পুরাতন হয়ে যাই।
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে
শ্রবণশক্তি কমে যায়
দুঃখের ভারে নুয়ে পড়া মন
অকারণ ভালবাসা খুঁজে বেড়ায়
শিশু বেলাকার মতো শুধু গ্রাহ্যের প্রহর
ফিরে পেতে ভারাক্রান্ত হয়ে যায় সব।
ভালো থেকো চাঁদ আমি ভালো নেই
ভালো থেকো আঁকাশ আমি ভালো নেই
ভালো থেকো সুর্য আমি ভালো নেই।


গাছটাও মরে গেছে - কবি শাহিনা খাতুন



যে দুঃখ পেয়েছে ঐ বুড়ো বটগাছ
তার নিরাময় কী
যে বাউল দুমুঠো ভাত চায়নি কোনদিন
তবুও মনের আনন্দে গান গেয়ে হেঁটে গেছে
তার লম্বা চুল অথবা খোঁপার ভেতর
কী এমন ভয় ছিল বলতে পার?
উত্তর জানা নেই
আহারে বকুলের ফুল!
তুমি শুকিয়ে যাওয়ার পরও গন্ধ বিলাও।
শীর্ণা নদীর ধারে কেঁদেছে পথিক
তার কোন ঘর নেই।
মহাজন মাথা গুনে নিয়ে গেছে তিনবার
মরে যাবার ভয়ে আড়াল খুঁজে নেওয়া
গাছটাও মরে গেছে
আজ সবটুকু নালিশ আমার নদীর কাছে
ও আমার পদ্মা নদী তুমি কি পদ্মাবতী?
নাকি আমার মা
সেবার কর্কট রোগে মা চলে গেছে
তারপর কতদিন মা বলে ডাকিনি
আজ মা বলে ডেকে ডেকে পরান জুড়াবো
আমার ভালবাসার খবর রাখেনা কেউ
কোন এক মহাকাব্যের পাতায়
আমার ভালবাসার কথা লিখে রেখো।

লেখক: কবি শাহিনা খাতুন

সময় চুরি - কামরান চৌধুরী


কবি - কামরান চৌধুরী

কাজের মাঝে লুকিয়ে থাকে আনন্দ অসীম
নিজেকে বিলিয়ে দাও জীবন বড় সসীম।
সময়কে অবহেলা করো না, মুক্তি পাবে না
তার সাথে ভাসিয়ে গা, মানিক তুলে আনো না।
কত যে সময় চুরি হয়ে যায় জীবনের
রাখিনা হিসাব তার পথ চলি মরণের।
যখনই ভাঙে ভুল দু’চোখে দেখিনা কূল
দুঃখ বিলাস করি, করি না যে, তা নির্মূল।
পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ যেন রে অনন্ত
ডুব দিয়ে তার মাঝে সুখ মাখো প্রাণবন্ত।
উদাসীন প্রবাহে যে চলতে চায় জীবন
সময়ের রশি দিয়ে বেঁধে রাখো আমরণ।
যা কিছু প্রাপ্তি, অর্জন আর সফলতা শান্তি
সময়কে কাজে বেঁধে, নাও সে স্বাদ প্রশান্তি।


১৬ মে, ২০২০।। শ্যামলী, ঢাকা।

হে ভুবন - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


 হে ভুবন
              আমি যতক্ষণ
          তোমারে না বেসেছিনু ভালো
              ততক্ষণ তব আলো
         খুঁজে খুঁজে পায় নাই তার সব ধন।
                ততক্ষণ
               নিখিল গগন
হাতে নিয়ে দীপ তার শূন্যে শূন্যে ছিল পথ চেয়ে।
 
              মোর প্রেম এল গান গেয়ে;
                     কী যে হল কানাকানি
দিল সে তোমার গলে আপন গলার মালাখানি।
                     মুগ্ধচক্ষে হেসে
                     তোমারে সে
গোপনে দিয়েছে কিছু যা তোমার গোপন হৃদয়ে
তারার মালার মাঝে চিরদিন রবে গাঁথা হয়ে।
 
 
  সুরুল, ২৮ পৌষ, ১৩২১  

যে-কথা বলিতে চাই - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যে-কথা বলিতে চাই,
         বলা হয় নাই,
             সে কেবল এই--
চিরদিবসের বিশ্ব আঁখি সম্মুখেই
             দেখিনু সহস্রবার
             দুয়ারে আমার।
     অপরিচিতের এই চির পরিচয়
এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
     সে-কথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
          আমি নাহি জানি।
 
শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে;
     নদীর এপারে ঢালু তটে
          চাষি করিতেছে চাষ;
     উড়ে চলিয়াছে হাঁস
ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালুতীরতলে।
          চলে কি না চলে
        ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
          আধো-জাগা নয়নের মতো।
          পথখানি বাঁকা
     বহুশত বরষের পদচিহ্ন-আঁকা
চলেছে মাঠের ধারে, ফসল-খেতের যেন মিতা,
     নদীসাথে কুটিরের বহে কুটুম্বিতা।
 
ফাল্গুনের এ-আলোয় এই গ্রাম, ওই শূন্য মাঠ,
              ওই খেয়াঘাট,
ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
      নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলি-কল্লোলে
          যেখানে বসায় মেলা-- এই সব ছবি
              কতদিন দেখিয়াছে কবি।
শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
     এই আলো, এই হাওয়া,
এইমতো অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
     ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
     অকস্মাৎ নদীস্রোতে
          ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
          হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।
 
 
পদ্মা, ৮ ফাল্গুন, ১৩২২

নারী - কাজী নজরুল ইসলাম

সাম্যের গান গাই-
   আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
   বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
   অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
   বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
   অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
   নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
   তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
   অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
   ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
   এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
   নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।
   তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছে যত ফল,
   অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
   জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
   সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’।
   পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহ!
   দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
   পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু।
   শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,
   নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
   নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’
   ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।

       স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
   নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার।
   নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
   যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
   নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’
   জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!
   জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
   মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।
   কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
   কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
   কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
   বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
   কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
   প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
   রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
   রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।

    পুরুষ হৃদয়-হীন,
মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।
ধরায় যাঁদের যশ ধরে না’ক অমর মহামানব,
বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,
খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা,-
লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন ক’রেছে সীতা।
নারী সে শিখা’ল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
দীপ্ত নয়নে পরা’ল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!
    তিনি নর-অবতার-
পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার।
পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।
    সে যুগ হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী!
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও , উঠিছে ডঙ্কা বাজি’।
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
     যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

    শোনো মর্ত্যের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

        ধরার দুলালী মেয়ে,
ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে।
কখন আসিল ‘প্নুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।
ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
লুটায়ে পড়িবে ও চরন-তলে দলিত যমের সাথে!
এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
   সেদিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!

হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক - কাজী নজরুল ইসলাম

হিন্দু-মুসলিম দুটি ভাই 
ভারতের দুই আঁখি তারা 
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম চারা।। 

যেন গঙ্গা সিন্ধু নদী 
যায় গো বয়ে নিরবধি 
এক হিমালয় হতে আসে, এক সাগরে হয় গো হারা।। 

বুলবুল আর কোকিল পাখী 
এক কাননে যায় গো ডাকি, 
ভাগীরথী যমুনা বয় মায়ের চোখের যুগল ধারা।। 

ঝগড়া করে ভায়ে ভায়ে 
এক জননীর কোল লয়ে 
মধুর যে এ কলহ ভাই পিঠোপিঠী ভায়ের পারা।। 

পেটে ধরা ছেলের চেয়ে চোখে ধরারা মায়া বেশী, 
অতিথী ছিল অতীতে, আজ সে সখা প্রতিবেশী। 
ফুল পাতিয়ে গোলাপ বেলী 
একই মায়ের বুকে খেলি, 
পাগলা তা'রা আল্লা ভগবানে ভাবে ভিন্ন যারা।।

দৃশ‍্যান্তর - অর্পিতা ঘোষ


১.
নিক্কণের তালে ঘুরে বেড়াতাম তখন...
দুচোখে স্বপ্ন মাখামাখি ভিড় করে আসতো হাজার,
আদরের আছিলায়, অচেনা চোখ দেখেছি বার বার।
মানে বোঝেনি তখন মন,
তবুও পালিয়ে যেতাম দূরত্বে...
স্মৃতিগুলো বন্দি এখনো নীল খামে,
বদলায়নি কিছুই, চারিদিকে বর্ণচোরার রূপ ধরে–
গন্ধ ছড়ায় আঁষটে।

২. 

আকাশী রঙের আঁচল ওড়ে বাতাসে,
তানসেন হতে ইচ্ছে জাগে মনে–
গুনগুনিয়ে সুর তুলি চৌকাঠে বসে,
কান্নার আওয়াজ হয়ে যায় কখন, সুর বদলে
কোনো বৃষ্টির মেঘ আসেনা ভেসে...
দেউড়িতে চাপা পড়ে আছি, মাটির অতলস্পর্শে।
তবুও যদি আসে, পারবেনা  ভেজাতে
 
অর্পিতা ঘোষ
      
 
লেখিকা পরিচিতি:- অর্পিতা ঘোষের জন্ম নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরে, বসবাস ও করে কৃষ্ণনগরে ।ছোট থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ। স্কুলে পড়াশোনা করার পাশাপাশি লেখার ও ঝোঁক ছিল, ছোট থেকেই গল্প কবিতা লেখে,ও ছোটোদের গল্প  ছড়া লেখে। বিভিন্ন কাব্য গ্রন্থে , বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকাই , মাসিক পত্রিকায় ও দৈনিক খবরের কাগজে অনেক লেখা প্রকাশিত , বাংলাদেশের পত্রিকা ও দৈনিক কাগজে ও লেখা প্রকাশিত ।


পারিব না - কালীপ্রসন্ন ঘোষ

‘পারিব না’ একথাটি বলিও না আর,
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার;
পাঁচজনে পারে যাহা,
তুমিও পারিবে তাহা,
পার কি না পার কর যতন আবার
একবার না পারিলে দেখ শতবার।
পারিবে না বলে মুখ করিও না ভার,
ও কথাটি মুখে যেন না শুনি তোমার।
অলস অবোধ যারা
কিছুই পারে না তারা,
তোমায় তো দেখি নাক তাদের আকার
তবে কেন ‘পারিব না’ বল বার বার ?
জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার,
হাঁটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়,
সাঁতার শিখিতে হলে
আগে তবে নাম জলে,
আছাড়ে করিয়া হেলা ‘হাঁট’ আর বার;
পারিব বলিয়া সুখে হও আগুসার।

কাল্পনিক চরিত্র কাল্পনিক প্রেম - বিনিতা দত্ত

বিনিতা দত্ত
 
রোজনামচা সংসারের ফাঁকে
কাল্পনিক জগতে কিছুটা সময়
বিরাজমান হতে চায় মন
যেখানে কিছু কাল্পনিক চরিত্র থাকে
যেগুলোকে নাড়াচাড়া করে
কিছুটা তৃপ্তি খুঁজে পায়
রঙীন চশমা পড়ে রঙীন জীবনে
ভেসে যেতে চায় মন
বাস্তব জীবনের সাথে কোথাও
মিল খুঁজে পাওয়া যায় না
সেই রঙীন মোড়কে
আছে প্রেম প্রেম খেলা ,
প্রতিশ্রুতি ভরা দলিল
আর গড়ে ওঠা তাসের দেশ
চরিত্র গুলো নিখুঁত ভাবে
পরিবেশন করা হয়
বহুরূপী সাজে ঘুরে বেড়ায়
গোলক ধাঁধার মতন
ব্যর্থ উপন্যাসটায় কেমন
যেন সোঁদা গন্ধ পাই
চরিত্রগুলো যখন তখন রঙ বদলায়
রেসকোর্সের বাজি ধরা ঘোড়ার
মতন ছোটে বল্গাহীন
পুরুষ চরিত্র ঘর পাল্টায়
নারী পাল্টালেই চরিত্রহীন
প্রশ্ন মাখা অজস্র চোখ
উত্তর খুঁজে চলেছে এই বাস্তব জগতে
ঠিকানাহীন ,বর্ণহীন বাস্তব জগতের
সাথে নেই কোন মিল
ক্ষনিকের ভালো লাগাকে
নাড়াচাড়া করে অবশেষে হতে হয় স্থিতিশীল

লুটেরা - কামরান চৌধুরী

কামরান চৌধুরী
 
করোনা ভাইরাস চৌদিকে গড়ছে ত্রাস
একে একে সব এলাকা করছে গ্রাস।
খাদ্য প্রাপ্তির আশায় অপেক্ষায় মন
ঘরে ঘরে খাদ্যাভাব গোপন ক্রন্দন।
কর্মহীন জন অনাহারে অর্ধাহারে
অসাধুরা কিভাবে তাদের খাদ্য কাড়ে।
ক্ষুধার্ত মানুষের ঘরে-বাইরে ভয়
দেখি সুবিধাবাদির নৈতিকতা ক্ষয়।

মজুতদারী ও মুনাফালোভীর দল
দেখেছি তোদের লোক দেখানোর ছল।
নিরন্ন মানুষের কেড়েছিস যে খাদ্য
জীবন তোদের হবেই হবে রে শ্রাদ্ধ।
অপরের ধন লুটে হবি তুই বড়?
নরকাগ্নিতে নিত্য জ্বলে পুড়েই মরো ।।