আপনি কি লেখক হতে চান? কিন্তু... লিখতে পারেন না। তাহলে আপনার জন্য আছে MINDGER

আপনার সাহিত্যজ্ঞান এসএসসি ও এইচএসসির পাঠ্যবইয়ের গল্প, উপন্যাস, কবিতায় সীমাবদ্ধ?

আপনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শামসুর রাহমান,জসীম উদ্‌দীন,জীবনানন্দ দাশ, শেক্সপিয়ার ছাড়া আর কোনো লেখকের লেখা তেমন পড়া বা শোনেননি?
এসব কোনো ব্যাপারই নয়! বিশ্বাস করুন, আপনাকে লেখক বানানোর দায়িত্ব ছেড়ে দিন আমাদের হাতে!
আপনি হবেন লেখক, আমরা প্রকাশ করতে প্রস্তুত আছি!
আমরা আপনার ‘লেভেল’ অনুযায়ী শেখাব, কী করে কবিতা , গল্প, উপন্যাস, বই  লিখতে হয়!
চলে আসুন আমাদের
Mindger Blog এ
ধরুন, আপনি কেবল স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ কোনো রকমে পারেন! আপনি বই লিখবেন ছোটদের জন্য। অনেক প্রকাশনীই ছোটদের বই বের করে, কিন্তু বেশির ভাগেরই নেই কোনো সাহিত্যগুণ কিংবা নতুনত্ব। আপনি যেহেতু কিছুই জানেন না, তাই কিছু একটা চেষ্টা করলে তাতে নতুনত্ব থাকবেই। আর যদি তেমন কিছু আপনার মাথা থেকে না-ই বের হয়, তাহলে আপনি ‘অমনোযোগী বাচ্চাদের জন্য’ শিরোনামে একটি বই লিখুন। অনেক মা-বাবাই বইটি কিনবেন। কারণ, এ যুগে মনোযোগী বাচ্চা বলতে কিছু নেই। বই তো বিক্রি হবেই!
আপনি তরুণ লেখক। আপনার চোখে স্বপ্ন—নামকরা লেখক হবেন। আপনি লিখুন, আমরা তো আছিই। আপনার যা ইচ্ছা লিখুন। কষ্ট করে ১০-১৫টা বই পড়ুন। সেগুলো থেকে কিছু চরিত্র নিয়ে কাহিনিতে প্যাঁচ লাগিয়ে দিন। আপনার এই বয়সে উদ্ভাবনী ক্ষমতা অনেক বেশি। বিখ্যাত ব্যক্তিদের অখ্যাত কাহিনি নিয়ে বই লিখুন। নিজের জীবনের কাহিনিও সেটার মধ্যে ‘পুশইন’ করে দিতে পারেন। কজন মানুষ জানে যে আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলায় কী করতেন! তাঁদের নিয়ে নতুন কিছু লিখলে পাঠক ওই বই কিনবেই।
আপনি বাল্যকালে দু-একটি গল্পের বই পড়েছিলেন। নানা রকম কাজের চাপে পড়ে আর তেমন পড়া হয়নি। পাশাপাশি আপনি আপনার জীবনের লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেননি। আপনি লিখবেন ‘সফল হওয়ার ১০১টি উপায়’। কারণ, আপনিই কেবল জানেন কী না করার কারণে আপনি ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা কী কী করলে সফল হওয়া যায়! আপনার মা-বাবা নিশ্চয়ই সারা জীবন অনেক উপদেশ দিয়েছেন। সেসব আপনি এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছেন সব সময়। ফলে বিল গেটস, মেসি কিংবা ওবামাদের থেকে আপনিই বেশি জানবেন আসলে কী করলে সফল হওয়া যায়। তত্ত্ব আপনিই দেবেন। সেগুলোর সঙ্গে বিখ্যাত ব্যক্তিদের নাম জুড়ে দেব আমরা।
আপনি ফেসবুক সেলিব্রিটি, কিন্তু বই লেখার মতো প্রতিভা আপনার নেই। তাতে কী! সমাধান আমাদের হাতে! প্রয়াত বিখ্যাত ব্যক্তিদের একটি তালিকা করুন। একেক বছর একেকজনকে নিয়ে লিখুন। ‘অমুককে যেমন দেখেছি’-জাতীয় বই আপনাকে নিয়ে যাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। বইয়ের প্রতি পৃষ্ঠায় লিখবেন বিখ্যাত ওই ব্যক্তির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কতটা উষ্ণ ছিল। সদ্যপ্রয়াত খুব জনপ্রিয় কাউকে নিয়ে লিখতে পারলে তো বইটা বেস্ট সেলারও হতে পারে। আর বর্তমানে যাঁরা প্রভাবশালী, তাঁদের তেল দিয়ে কিছু একটা লিখুন, বই তো বিক্রি হবেই, প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও আপনাকে কাছে টেনে নেবেন।
MINDGER
লে খ ক তৈ রি র কা র খা না।


আপনি আপনার মত করে লিখুন MINDGER ব্লগ এ। শুধু ধর্ম, রাষ্ট্র, প্রতিহিংসা বিরোধী কোন লেখা লিখবেন না। এ ছাড়া যে কোন লেখা আমরা প্রকাশ করবো।

এই দেশ


কবি -  কামরান চৌধুরী

এই দেশ আমার, এই মাটি আমার
এই মাটিতে জন্ম, এই মাটিতে মৃত্যু
এই খানেতে স্বপ্ন, এই খানেতে প্রেম
এই জীবন নদী, কাটছে নিরবধি।

পদ্ম দিঘির জল কোথায় পাব বল
মাঠে শস্যের ঘ্রাণ আকুল করে প্রাণ,
পাখির কলতানে, মুখর জনে জনে
ফুলেফুলে সুবাসে নাচে মন তিয়াসে।
ঝরা বকুল ফুলে একাকী মালা গাঁথি
তোমার আমার মন এক সুরে বাঁধি।
যাবোনা ছেড়ে কোথা দেশকে ফেলে একা
যত শ্বাস বুকেতে, রাখি যত্ন সাধনে।
দেশপ্রেমে শপথে আগলে রাখবো যে
যতটুকু দায়িত্ব পালন করবো রে।।

কবি -  কামরান চৌধুরী  

১৫ ডিসেম্বর ২০১৬।।রাত ১১:২০ শ্যামলী, ঢাকা।।

আমার মনের জানলাটি আজ হঠাৎ গেল খুলে

আমার মনের জানলাটি আজ হঠাৎ গেল খুলে
          তোমার মনের দিকে।
সকালবেলার আলোয় আমি সকল কর্ম ভুলে
          রইনু অনিমিখে।
 
          দেখতে পেলেম তুমি মোরে
          সদাই ডাক যে-নাম ধ'রে
     সে-নামটি এই চৈত্রমাসের পাতায় পাতায় ফুলে
              আপনি দিলে লিখে।
     সকালবেলার আলোতে তাই সকল কর্ম ভুলে
               রইনু অনিমিখে।
 
     আমার সুরের পর্দাটি আজ হঠাৎ গেল উড়ে
              তোমার গানের পানে।
     সকালবেলার আলো দেখি তোমার সুরে সুরে
              ভরা আমার গানে।
              মনে হল আমারি প্রাণ
          তোমার বিশ্বে তুলেছে তান,
     আপন গানের সুরগুলি সেই তোমার চরণমূলে
              নেব আমি শিখে।
     সকালবেলার আলোতে তাই সকল কর্ম ভুলে
              রইনু অনিমিখে।
 
 কবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  সুরুল, ২১ চৈত্র, ১৩২১

যে-কথা বলিতে চাই

যে-কথা বলিতে চাই,
         বলা হয় নাই,
             সে কেবল এই--
চিরদিবসের বিশ্ব আঁখিসম্মুখেই
             দেখিনু সহস্রবার
             দুয়ারে আমার।
     অপরিচিতের এই চির পরিচয়
এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
     সে-কথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
          আমি নাহি জানি।
 
শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে;
     নদীর এপারে ঢালু তটে
          চাষি করিতেছে চাষ;
     উড়ে চলিয়াছে হাঁস
ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালুতীরতলে।
          চলে কি না চলে
        ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
          আধো-জাগা নয়নের মতো।
          পথখানি বাঁকা
     বহুশত বরষের পদচিহ্ন-আঁকা
চলেছে মাঠের ধারে, ফসল-খেতের যেন মিতা,
     নদীসাথে কুটিরের বহে কুটুম্বিতা।
 
ফাল্গুনের এ-আলোয় এই গ্রাম, ওই শূন্য মাঠ,
              ওই খেয়াঘাট,
ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
      নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলি-কল্লোলে
          যেখানে বসায় মেলা-- এই সব ছবি
              কতদিন দেখিয়াছে কবি।
শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
     এই আলো, এই হাওয়া,
এইমতো অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
     ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
     অকস্মাৎ নদীস্রোতে
          ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
          হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।
 
 কবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পদ্মা, ৮ ফাল্গুন, ১৩২২

তোমারে কি বারবার করেছিনু অপমান

তোমারে কি বারবার করেছিনু অপমান।
          এসেছিলে গেয়ে গান
              ভোরবেলা;
    ঘুম ভাঙাইলে ব'লে মেরেছিনু ঢেলা
              বাতায়ন হতে,
    পরক্ষণে কোথা তুমি লুকাইলে জনতার স্রোতে।
              ক্ষুধিত দরিদ্রসম
          মধ্যাহ্নে, এসেছে দ্বারে মম।
          ভেবেছিনু, এ কী দায়,
কাজের ব্যাঘাত এ-যে।' দূর হতে করেছি বিদায়।
 
     সন্ধ্যাবেলা এসেছিলে যেন মৃত্যুদূত
          জ্বালায়ে মশাল-আলো, অস্পষ্ট অদ্ভুত
              দুঃস্বপ্নের মতো।
     দস্যু ব'লে শত্রু ব'লে ঘরে দ্বার যত
          দিনু রোধ করি।
     গেলে চলি, অন্ধকার উঠিল শিহরি।
এরি লাগি এসেছিলে, হে বন্ধু অজানা--
          তোমারে করিব মানা,
    তোমারে ফিরায়ে দিব, তোমারে মারিব,
       তোমা-কাছে যত ধার সকলি ধারিব,
              না করিয়া শোধ
              দুয়ার করিব রোধ।
 
              তার পরে অর্ধরাতে
          দীপ-নেবা অন্ধকারে বসিয়া ধুলাতে
              মনে হবে আমি বড়ো একা
          যাহারে ফিরায়ে দিনু বিনা তারি দেখা।
              এ দীর্ঘ জীবন ধরি
          বহুমানে যাহাদের নিয়েছিনু বরি
              একাগ্র উৎসুক,
          আঁধারে মিলায়ে যাবে তাহাদের মুখ।
              যে আসিল ছিনু অন্যমনে,
          যাহারে দেখি নি চেয়ে নয়নের কোণে,
              যারে নাহি চিনি,
          যার ভাষা বুঝিতে পারি নি,
অর্ধরাতে দেখা দিবে বারেবারে তারি মুখ নিদ্রাহীন চোখে
          রজনীগন্ধার গন্ধে তারার আলোকে।
     বারেবারে ফিরে-যাওয়া অন্ধকারে বাজিবে হৃদয়ে
          বারেবারে-ফিরে-আসা হয়ে।
 
কবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 শিলাইদা, ৮ ফাল্গুন, ১৩২২

ভাবনা নিয়ে মরিস কেন খেপে


ভাবনা নিয়ে মরিস কেন খেপে।
          দুঃখ-সুখের লীলা
     ভাবিস এ কি রইবে বক্ষে চেপে
          জগদ্দলন-শিলা।
     চলেছিস রে চলাচলের পথে
     কোন্‌ সারথির উধাও মনোরথে?
     নিমেষতরে যুগে যুগান্তরে
          দিবে না রাশ-ঢিলা।
 
     শিশু হয়ে এলি মায়ের কোলে,
          সেদিন গেল ভেসে।
     যৌবনেরি বিষম দোলার দোলে
          কাটল কেঁদে হেসে।
     রাত্রে যখন হচ্ছিল দীপ জ্বালা
     কোথায় ছিল আজকে দিনের পালা।
     আবার কবে কী সুর বাঁধা হবে
          আজকে পালার শেষে।
 
     চলতে যাদের হবে চিরকালই
          নাইকো তাদের ভার।
     কোথা তাদের রইবে থলি-থালি,
          কোথা বা সংসার।
     দেহযাত্রা মেঘের খেয়া বাওয়া,
     মন তাহাদের ঘূর্ণা-পাকের হাওয়া;
     বেঁকে বেঁকে আকার এঁকে এঁকে
          চলছে নিরাকার।
 
     ওরে পথিক, ধর্‌-না চলার গান,
          বাজা রে একতারা।
     এই খুশিতেই মেতে উঠুক প্রাণ--
          নাইকো কূল-কিনারা।
     পায়ে পায়ে পথের ধারে ধারে
     কান্না-হাসির ফুল ফুটিয়ে যা রে,
     প্রাণ-বসন্তে তুই-যে দখিন হাওয়া
          গৃহ-বাঁধন-হারা!
 
     এই জনমের এই রূপের এই খেলা
          এবার করি শেষ;
     সন্ধ্যা হল, ফুরিয়ে এল বেলা,
          বদল করি বেশ।
     যাবার কালে মুখ ফিরিয়ে পিছু
     কান্না আমার ছড়িয়ে যাব কিছু,
     সামনে সে-ও প্রেমের কাঁদন ভরা
          চির-নিরুদ্দেশ।
 
     বঁধুর চিঠি মধুর হয়ে আছে
          সেই অজানার দেশে।
     প্রাণের ঢেউ সে এমনি করেই নাচে
          এমনি ভালোবেসে।
     সেখানেতে আবার সে কোন্‌ দূরে
     আলোর বাঁশি বাজবে গো এই সুরে
     কোন্‌ মুখেতে সেই অচেনা ফুল
          ফুটবে আবার হেসে।
 
     এইখানে এক শিশির-ভরা প্রাতে
          মেলেছিলেম প্রাণ।
     এইখানে এক বীণা নিয়ে হাতে
          সেধেছিলেম তান।
     এতকালের সে মোর বীণাখানি
     এইখানেতেই ফেলে যাব জানি,
     কিন্তু ওরে হিয়ার মধ্যে ভরি
          নেব যে তার গান।
 
     সে-গান আমি শোনাব যার কাছে
          নূতন আলোর তীরে,
     চিরদিন সে সাথে সাথে আছে
          আমার ভুবন ঘিরে।
     শরতে সে শিউলি-বনের তলে
     ফুলের গন্ধে ঘোমটা টেনে চলে,
     ফাল্গুনে তার বরণমালাখানি
          পরাল মোর শিরে।
 
     পথের বাঁকে হঠাৎ দেয় সে দেখা
          শুধু নিমেষতরে।
     সন্ধ্যা-আলোয় রয় সে বসে একা
          উদাস প্রান্তরে।
     এমনি করেই তার সে আসা-যাওয়া,
     এমনি করেই বেদন-ভরা হাওয়া
     হৃদয়-বনে বইয়ে সে যায় চলে
          মর্মরে মর্মরে।
 
     জোয়ার-ভাঁটার নিত্য চলাচলে
          তার এই আনাগোনা।
     আধেক হাসি আধেক চোখের জলে
          মোদের চেনাশোনা।
     তারে নিয়ে হল না ঘর বাঁধা,
     পথে পথেই নিত্য তারে সাধা
     এমনি করেই আসা-যাওয়ার ডোরে
          প্রেমেরি জাল-বোনা।
 
কবি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 
 
শান্তিনিকেতন, ২৯ ফাল্গুন, ১৩২২
 

#বলাকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বলাকা কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন উইলিয়াম পিয়রসনকে। ১৯১৫-১৬ সালে কবির কাব্যগ্রন্থ নামক কাব্যসংকলনেও এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ।

এই কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় পূর্ববর্তী গীতাঞ্জলি-পর্বের ঈশ্বরানুভূতি ও অতীন্দ্রিয় চেতনা থেকে মুক্ত হয়ে কবি একটি স্বতন্ত্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন। "যৌবনের জয়গান, চলমান বিশ্বের অনিঃশেষ যাত্রা, ভাষার বর্ণাঢ্য উজ্জ্বলতা ও ছন্দের অপ্রতিহত প্রবাহ বলাকার বৈশিষ্ট্য।"

এই কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলি হল "সবুজের অভিযান", "শঙ্খ", "ছবি", "শা-জাহান", "বলাকা" ইত্যাদি।
 

যৌবন রে, তুই কি রবি সুখের খাঁচাতে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


যৌবন রে, তুই কি রবি সুখের খাঁচাতে।
     তুই যে পারিস কাঁটাগাছের উচ্চ ডালের 'পরে
                    পুচ্ছ নাচাতে।
     তুই পথহীন সাগরপারের পান্থ,
     তোর ডানা যে অশান্ত অক্লান্ত,
          অজানা তোর বাসার সন্ধানে রে
              অবাধ যে তোর ধাওয়া;
          ঝড়ের থেকে বজ্রকে নেয় কেড়ে
              তোর যে দাবিদাওয়া।
 
যৌবন রে, তুই কি কাঙাল, আয়ুর ভিখারী।
     মরণ-বনের অন্ধকারে গহন কাঁটাপথে
                    তুই যে শিকারি।
     মৃত্যু যে তার পাত্রে বহন করে
     অমৃতরস নিত্য তোমার তরে;
          বসে আছে মানিনী তোর প্রিয়া
              মরণ-ঘোমটা টানি।
          সেই আবরণ দেখ্‌ রে উতারিয়া
              মুগ্ধ সে মুখখানি।
 
যৌবন রে, রয়েছ কোন্‌ তানের সাধনে।
     তোমার বাণী শুষ্ক পাতায় রয় কি কভু বাঁধা
                     পুঁথির বাঁধনে।
     তোমার বাণী দখিন হাওয়ার বীণায়
     অরণ্যেরে আপনাকে তার চিনায়,
          তোমার বাণী জাগে প্রলয়মেঘে
              ঝড়ের ঝংকারে;
     ঢেউয়ের 'পরে বাজিয়ে চলে বেগে
          বিজয়-ডঙ্কা রে।
 
যৌবন রে, বন্দী কি তুই আপন গণ্ডিতে।
     বয়সের এই মায়াজালের বাঁধনখানা তোরে
          হবে খণ্ডিতে।
     খড়গসম তোমার দীপ্ত শিখা
     ছিন্ন করুক জরার কুজ্‌ঝটিকা,
     জীর্ণতারি বক্ষ দু-ফাঁক ক'রে
              অমর পুষ্প তব
     আলোকপানে লোকে লোকান্তরে
              ফুটুক নিত্য নব।
 
যৌবন রে, তুই কি হবি ধুলায় লুণ্ঠিত।
     আবর্জনার বোঝা মাথায় আপন গ্লানিভারে
                         রইবি কুণ্ঠিত?
     প্রভাত যে তার সোনার মুকুটখানি
     তোমার তরে প্রত্যুষে দেয় আনি,
          আগুন আছে ঊর্ধ্ব শিখা জ্বেলে
              তোমার সে যে কবি।
          সূর্য তোমার মুখে নয়ন মেলে
              দেখে আপন ছবি।
 
 
শান্তিনিকেতন, ৪ চৈত্র, ১৩২২
 

#বলাকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বলাকা কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন উইলিয়াম পিয়রসনকে। ১৯১৫-১৬ সালে কবির কাব্যগ্রন্থ নামক কাব্যসংকলনেও এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ।

এই কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় পূর্ববর্তী গীতাঞ্জলি-পর্বের ঈশ্বরানুভূতি ও অতীন্দ্রিয় চেতনা থেকে মুক্ত হয়ে কবি একটি স্বতন্ত্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন। "যৌবনের জয়গান, চলমান বিশ্বের অনিঃশেষ যাত্রা, ভাষার বর্ণাঢ্য উজ্জ্বলতা ও ছন্দের অপ্রতিহত প্রবাহ বলাকার বৈশিষ্ট্য।"

এই কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলি হল "সবুজের অভিযান", "শঙ্খ", "ছবি", "শা-জাহান", "বলাকা" ইত্যাদি।
 

পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি
          ওই কেটে গেল; ওরে যাত্রী।
     তোমার পথের 'পরে তপ্ত রৌদ্র এনেছে আহ্বান
              রুদ্রের ভৈরব গান।
                  দূর হতে দূরে
          বাজে পথ শীর্ণ তীব্র দীর্ঘতান সুরে,
                  যেন পথহারা
              কোন্‌ বৈরাগীর একতারা।
 
              ওরে যাত্রী,
     ধূসর পথের ধুলা সেই তোর ধাত্রী;
চলার অঞ্চলে তোরে ঘূর্ণাপাকে বক্ষেতে আবরি
         ধরার বন্ধন হতে নিয়ে যাক হরি
              দিগন্তের পারে দিগন্তরে।
     ঘরের মঙ্গলশঙ্খ নহে তোর তরে,
          নহে রে সন্ধ্যার দীপালোক,
          নহে প্রেয়সীর অশ্রু-চোখ।
পথে পথে অপেক্ষিছে কালবৈশাখীর আশীর্বাদ,
          শ্রাবণরাত্রির বজ্রনাদ।
     পথে পথে কন্টকের অভ্যর্থনা,
     পথে পথে গুপ্তসর্প গুপ্তসর্প গূঢ়ফণা।
          নিন্দা দিবে জয়শঙ্খনাদ
          এই তোর রুদ্রের প্রসাদ।
 
     ক্ষতি এনে দিবে পদে অমূল্য অদৃশ্য উপহার।
          চেয়েছিলি অমৃতের অধিকার--
     সে তো নহে সুখ, ওরে, সে নহে বিশ্রাম,
          নহে শান্তি, নহে সে আরাম।
          মৃত্যু তোরে দিবে হানা,
          দ্বারে দ্বারে পাবি মানা,
     এই তোর নব বৎসরের আশীর্বাদ,
          এই তোর রুদ্রের প্রসাদ
          ভয় নাই, ভয় নাই, যাত্রী।
     ঘরছাড়া দিকহারা অলক্ষ্মী তোমার বরদাত্রী।
 
     পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি
          ওই কেটে গেল, ওরে যাত্রী।
              এসেছে নিষ্ঠুর,
          হোক রে দ্বারের বন্ধ দূর,
          হোক রে মদের পাত্র চুর।
     নাই বুঝি, নাই চিনি, নাই তারে জানি,
          ধরো তার পাণি;
     ধ্বনিয়া উঠুক তব হৃৎকম্পনে তার দীপ্ত বাণী।
          ওরে যাত্রী
     গেছে কেটে, যাক কেটে পুরাতন রাত্রি।
 
 
কলিকাতা, ৯ বৈশাখ, ১৩২৩
 

#বলাকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বলাকা কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন উইলিয়াম পিয়রসনকে। ১৯১৫-১৬ সালে কবির কাব্যগ্রন্থ নামক কাব্যসংকলনেও এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ।

এই কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় পূর্ববর্তী গীতাঞ্জলি-পর্বের ঈশ্বরানুভূতি ও অতীন্দ্রিয় চেতনা থেকে মুক্ত হয়ে কবি একটি স্বতন্ত্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন। "যৌবনের জয়গান, চলমান বিশ্বের অনিঃশেষ যাত্রা, ভাষার বর্ণাঢ্য উজ্জ্বলতা ও ছন্দের অপ্রতিহত প্রবাহ বলাকার বৈশিষ্ট্য।"

এই কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলি হল "সবুজের অভিযান", "শঙ্খ", "ছবি", "শা-জাহান", "বলাকা" ইত্যাদি।
 

দেশের বাণী – কায়কোবাদ


কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!

‘আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় আলস্য, নারীর চেয়েও প্রিয়’- হাসান হাফিজ

 ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—এই অমর পঙ্ক্তিই বিখ্যাত করেছে কবি হেলাল হাফিজকে, পাল্টে দিয়েছে তাঁর জীবনধারাও। ৭ অক্টোবর বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই কবির ৭২তম জন্মদিন। জন্মদিনের ক্ষণে প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়ে প্রথমবারের মতো তিনি উন্মোচন করলেন তাঁর লেখালেখি, প্রেম, বিরহসহ জীবনের নানা অজানা অধ্যায়। 
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজ: ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা লিখে যৌবনেই বিখ্যাত হয়ে যান আপনি, সেই কবিতায় তখন লিখেছিলেন ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ বর্তমানে জীবনসায়াহ্নে এসে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে ওই ধরনের পঙ্ক্তি কি আর লিখতে ইচ্ছা করে? কী মনে হয় এখন এই কবিতার দিকে তাকিয়ে?
হেলাল হাফিজ: ‘এখন যৌবন যার...’, এই দ্যুতিময় পঙ্ক্তির যিনি স্রষ্টা, তিনি তো চিরনবীন। বাস্তবে তার বয়স যতই হোক না কেন। এটা ঠিক, শরীর একটা বড় ফ্যাক্টর। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সমাজে যত দিন অন্যায় উৎপীড়ন অনিয়ম অনাচার থাকবে, এই পঙ্ক্তিমালাকে আশ্রয় করে প্রতিবাদী কিছু মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে। রুখে দাঁড়াবে অন্যায় ও বৈষম্য। এই কবিতাপঙ্ক্তি তাদের প্রাণিত করবে। এমনটা হতেই পারে যে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকতে চাইবে। কলাটা-মুলোটার জন্য। কিন্তু কিছু মানুষ তো ব্যতিক্রমী থাকবেই। তারা রুখে দাঁড়াবে। অন্যায়-অবিচারের অবসান চাইবে।
হাসান: এই কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাই।
হেলাল: কবিতাটা লেখা হয়েছিল ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। তখন জাতি ছিল স্বাধীনতা-উন্মুখ, দেশ ছিল টালমাটাল। ওই সময়ে দেশ যে কেমন অগ্নিগর্ভ ছিল, এখনকার ছেলেমেয়েরা তা চিন্তাও করতে পারবে না। আজকাল মিছিল-মিটিং হয় টাকার বিনিময়ে। সে সময়ে এ রকমটা হতো না। সবই হতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আদর্শের একটা ব্যাপার ছিল। আমি কোনো রাজনৈতিক বা ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না; না ছাত্রজীবনে, না কর্মজীবনে। কোনো মিছিলে আমি কখনো যাইনি। তবে ভেতরে-ভেতরে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বপ্ন-প্রত্যাশা, আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারটি বুকে ধারণ করতাম ঠিকই। ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—ওই কবিতাটা সময়ই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে।
হাসান: সময় তো আপনাকে দিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখিয়ে নিল, কিন্তু এ কবিতার কথা মানুষ জানল কীভাবে?
হেলাল: ছফা ভাই (আহমদ ছফা) ও কবি হুমায়ুন কবির সদ্য লেখা সেই কবিতাসহ আমাকে নিয়ে গেলেন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা অফিসে, স্বনামধন্য কবি আহসান হাবীবের কাছে। হাবীব ভাই তখন দৈনিক পাকিস্তান-এর সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করেন। তিনি কবিতাটি পড়লেন। তারপর মিষ্টি করে একটু হাসলেন। পড়া শেষে বললেন, শোনো তোমরা, এই কবিতা ছাপা যাবে না। ছাপলে আমার চাকরিটা চলে যাবে। পত্রিকা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে একটা কথা বলি, হেলালের আর কোনো কবিতা না লিখলেও চলবে। অমরত্ব ওর করায়ত্ত হয়ে গেছে।
ওই একটা কবিতা আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। কর্মজীবনের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা, মানুষজনের আদর-আপ্যায়ন যা পেয়েছি জীবনে, তার পেছনে এই কবিতার বড় অবদান রয়েছে। আমি যখন ছাত্র, তখনই আমার চাকরি হয়ে যায় দৈনিক পূর্বদেশ-এ। সেটা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে। সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী দ্বিধান্বিত ছিলেন, ছাত্রকে কেমন করে চাকরি দেবেন। তখন অবজারভার হাউসের বড় কর্তা কবি আবদুল গনি হাজারী হায়দার ভাইকে বলেন, যে ছেলে এমন কবিতা লিখতে পারে, তার ব্যাপারে অন্য কোনো কিছু বিবেচনার দরকার নেই। তুমি বাপু, এখনি নিয়োগপত্র দিয়ে দাও ওকে। ব্যস, চাকরি হয়ে গেল আমার।
হেলাল হাফিজ। ছবি: জিয়া ইসলামহেলাল হাফিজ। ছবি: জিয়া ইসলামহাসান: আপনার জীবন নিয়েও রয়েছে নানা কিংবদন্তি। আজীবন হোটেলে হোটেলে কাটালেন। প্রেসক্লাবে আড্ডা দিয়ে জীবন পার করলেন। জীবনটাকে এমনভাবে বইতে দিলেন কেন?
হেলাল: ওই যে বললাম, ওই একটি কবিতা আমার জীবনধারা পাল্টে দিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে ওই কবিতা আমাকে রীতিমতো স্টার বানিয়ে দেয়। এখন কী মনে হয় জানো, তা-ই বোধ হয় কাল হয়েছে। উত্তাল উনসত্তরের অগ্নিঝরা সময়ে ওই কবিতা লেখার পর অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকল আমার জীবনে। মাত্র দুই রাতে গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান হিসেবে এই পঙ্ক্তি লেখা হলো। চিকা মারা যাকে বলে। এখনকার প্রজন্ম অবশ্য চিকা মারা কী, সেটার মর্ম বুঝতে পারবে না। গভীর রাতে, ভীতিকর পরিবেশে দেয়াললিখনরত তরুণদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কী করছ? উত্তরে ওরা বলেছিল, চিকা (ছুঁচো) মারছি। সেই থেকে দেয়াললিখনের কাজকে বলা হতো চিকা মারা।
সেই সময় এমন হতো, হল থেকে ক্লাসে যাচ্ছি, টিএসসিতে যাচ্ছি, মেয়েরা বলাবলি করত, ওই যে কবি যায়। আমার নাম বলত না, ওই কবিতার কথা বলত। স্বাধীনতার পরও চার-পাঁচ বছর আমি সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (সাবেক ইকবাল হল) ছিলাম। তখন নিয়ম ছিল, পরীক্ষা হয়ে গেলে হলের সিট ছেড়ে দিতে হতো। প্রভোস্টকে বলায় তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি থাকতে পারবে। তবে বাবা, একটু আড়ালে-আবডালে থাকবে।’ ১৯৭৫ সালের আগস্ট ট্র্যাজেডির পর হল ছেড়ে দিই আমি। টিএসসিতে কখনো আমাকে নিজের পয়সায় খেতে হয়নি ওই কবিতার কারণেই।
আমি একটু দুষ্টুও ছিলাম সে সময়। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের এক ক্লাস ওপরে পড়তেন। তখন তাঁকে দেখলেই দুষ্টুমি করে বলতাম, ওই যে অড্রে হেপবার্ন যায়। বঙ্গবন্ধুর বুকে মাথা রেখেছে তাঁর আদুরে জ্যেষ্ঠা কন্যা—এ রকম একটা ছবি আছে। ওই ছবি দেখলে আমার এই নামকরণের সারবত্তাটা তুমি বুঝতে পারবে। শেখ হাসিনাকে যে অড্রে হেপবার্ন বলতাম, তিনি সেটা বেশ উপভোগ করতেন বলে মনে হয়। সেই সময়ে সোফিয়া লরেন, অড্রে হেপবার্ন, সুচিত্রা সেন—এঁরা ছিলেন বিখ্যাত নায়িকা।
হাসান: ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নিয়ে আর কোনো স্মরণীয় স্মৃতির কথা মনে পড়ে?
হেলাল: বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বিভাগ ছাড়িয়ে আমার কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। তত দিনে আরও কয়েকটি মিষ্টি প্রেমের কবিতা লিখেছি। সেসব যে খুব শিল্পগুণসম্পন্ন, তা নয়। তখনকার সমাজ তুলনামূলকভাবে সুস্থির ছিল। কোমলতা ছিল মানুষের মনে। যেমন, এতকাল পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনে রেখেছেন। আগেই বলেছি, আমার জীবন মূলত জাতীয় প্রেসক্লাবকেন্দ্রিক। শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিবছরই প্রেসক্লাবে আসেন—কখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, কখনোবা বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবেও। আমি কখনোই তাঁর ধারেকাছে যাই না। ২০১৪ সালে যখন আমি তাঁর হাত থেকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করি, তখন ধরা পড়তেই হলো। একাডেমি মঞ্চে পুরস্কার নিচ্ছি। তাঁর নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের আগেভাগেই বলে দিয়েছেন কোনো কথাবার্তা নয়। কিন্তু শেখ হাসিনা প্রটোকল ভেঙে আমার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বললেন। সে এক বিড়ম্বনাময় পরিস্থিতি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের টুনটুনি কেমন আছে রে, ওর কোনো খবর জানিস? দুষ্টু মেয়ে টুনটুনি স্বাধীনতা-পূর্বকালে ছাত্রলীগ করত। প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন হাসির কথা। হাসি তৎকালীন ছাত্রলীগের চার খলিফার একজন প্রয়াত আবদুল কুদ্দুস মাখনের স্ত্রী। অনির্ধারিত কথায় কথায় এইভাবে চার-পাঁচ মিনিট সময় কেটে গেল। নিরাপত্তাকর্মীরা ভীষণ উসখুস করছিলেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে পরে আবার দেখা হয় গণভবনে। আমার চোখের চিকিৎসার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ওকে অফিসে নয়, গণভবনে আসতে বলো। তাই গেলাম। প্রচুর খাবারের ব্যবস্থা ছিল। মুঠোফোন, কাঁধে ঝোলা সঙ্গে নিয়েই আমি গণভবনে ঢুকেছি। অথচ এগুলো নিয়ে ঢোকা যায় না। কঠিন নিষেধাজ্ঞা আছে। প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন বলে কোনো অসুবিধা হয়নি। শেখ হাসিনা আমার ঝোলা হাতড়ে দেখলেন। বললেন, কী আছে এর ভেতরে? চোখের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি বললেন, যত যা লাগে, আমি দেব।
হাসান: সেই সময়—মানে আপনার যৌবনের কথা কি আরেকটু বিশদভাবে বলবেন?
হেলাল: বরাবরই আমি অব্যবস্থিতচিত্ত মানুষ। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া অনিশ্চিত। একধরনের বোহিমিয়ান জীবন যাপন করি। খাবারদাবারের কষ্ট অবশ্য হয়নি। অগ্রজ কবি শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমানের কাছে ধরনা দিয়ে আমি আর আবুল হাসান খাবারের জন্য টাকাপয়সা নিতাম। হাসান ভাই পাঁচ টাকার বেশি দিতেন না। ইচ্ছা করেই। তিনি বলতেন, তাহলে এরা উল্টা-পাল্টা খরচ করবে। তখন পাঁচ টাকা কিন্তু অনেক। এই টাকাপয়সার ফেরে পড়ে সে সময় এক-আধটু অনৈতিক কাজও যে করিনি, তা নয়। কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্র একটা প্রবন্ধ ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের কবিতায় প্রকৃতি’। বাংলা একাডেমির পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা একটু অদলবদল করে নতুন একটা প্রবন্ধ দাঁড় করিয়ে ফেললাম। সেটা ছাপা হলো পাকিস্তানী খবর-এ। সুশোভন আনোয়ার আলী ছাপলেন। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। তো, ওই অদলবদল মানে চুরি করে লেখা প্রবন্ধের জন্য সম্মানী কত পেলাম, জানো? ৭৫ টাকা। সে এক বিশাল অঙ্ক। যেদিন এত্তগুলো টাকা বিল পেলাম, কীভাবে তা খরচ করব, ঠিকঠাক ঠাহর করে উঠতে পারছিলাম না। সে সময় আমার মধ্যে যে উচ্ছৃঙ্খলতা এসেছিল, তা-ও কিন্তু কবিতার জন্যই।
হাসান: বিয়ে করলেন না কেন?
হেলাল: আমি বিয়ে করিনি, এটা ঠিক। তবে এটাও তো ঠিক হতে পারে যে কোনো মেয়েও আমাকে বিয়ে করেনি বা করতে চায়নি।
হেলাল হাফিজ। ছবি: জিয়া ইসলাম
হেলাল হাফিজ। ছবি: জিয়া ইসলামহাসান: আপনার কবিখ্যাতি যেমন প্রবল, তেমনি নারীভাগ্যও তো বেশ ভালো। এই ব্যাপারটা কি একটু খোলাসা করে বলা যাবে?
হেলাল: স্কুলজীবন থেকেই আমাকে দেখে আকৃষ্ট হতো মেয়েরা। সুশ্রী ছিলাম। খেলাধুলা প্রিয় ছিল। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সফল ছিলাম। বাংলা ও ইংরেজি কবিতার আবৃত্তি, গল্পবলা, উপস্থিত বক্তৃতায় পুরস্কার পেতাম। ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়েছি প্রায়ই। সুন্দর হাতের লেখার জন্যও পুরস্কৃত হয়েছি বহুবার। আমার পুরস্কারের সব বই নেত্রকোনা পাবলিক লাইব্রেরিতে উপহার হিসেবে দিয়ে দিই। এর বিনিময়ে আমার আব্বাকে পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন সদস্য পদ দেওয়া হয়েছিল।
তো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর অসংখ্য বান্ধবী হলো আমার। কোনো অভাব ছিল না। আবার স্বাধীনতার পর যখন পূর্বদেশ-এর মতো কাগজের সাহিত্য সম্পাদক হলাম, সেটাও একটা বাড়তি সুযোগ তৈরি করে দিল।
হাসান: নারীদের কাছ থেকে কী ধরনের উপহার বেশি পেয়ে থাকেন আপনি?
হেলাল: সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি উপহার পেতাম চুমু, ফুল, কলম। নানান নামের সুগন্ধি, মধ্যাহ্নভোজের টাকা, শার্ট ও প্যান্টের পিস (সত্তরের দশকে, রেডিমেড প্যান্ট তেমন একটা পাওয়া যেত না)। গত পাঁচ-সাত বছরে সবচেয়ে বেশি উপহার যা পাচ্ছি, তা হলো গলার মালা। হাতের ব্রেসলেট। আমার কিছু মেয়ে ভক্ত আমাকে এগুলো পরতে বাধ্য করছে। এসব তারা জোগান দিয়েও চলেছে।
হাসান: আপনার জীবনে তো অজস্র প্রেম এসেছে। প্রেমের কথা বলুন...
হেলাল: কৈশোরে হেলেন নামের এক তরুণীর সঙ্গে প্রেম হয়েছিল। আমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট ছিল। কবিতায় তার কথা লিখেছি। ওর সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্ব, ভালো লাগা, পরে হলো প্রেম। সেটা ঘটেছিল নেত্রকোনায়। ওই প্রণয় পরিণতি পায়নি। ওকে খুব পছন্দ করতাম। সে-ও ভালোবাসত আমাকে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো সে।
১৯৭৩ সালে যখন আমার অনার্স পরীক্ষা সামনে, তখন বড় দুটি মর্মান্তিক ঘটনা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় আমার। আমার আব্বা—যিনি আমার মা-ও ছিলেন—হঠাৎই মারা যান। এর এক-দেড় মাস পর হেলেনের সঙ্গে আকস্মিক ব্রেকআপ হয়ে গেল আমার। হেলেনের কথা সবিস্তারে এই প্রথম বলছি। তো এখন যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, সেটা আগে ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। ওই চত্বরে বিখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমেদের বেশ কিছু ভাস্কর্য ছিল। একটি ভাস্কর্যের পাশে আমরা দুজন বসলাম একদিন। হেলেন আমাকে চমকে দিয়ে বলল, আমি তো অন্য একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছি।
হাসান: এটা শুনে কী প্রতিক্রিয়া হলো আপনার?
হেলাল: আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বজ্রাহত। চোখে পানি এসে গেল। হায়! এত গভীর ভালোবাসার এই পরিণতি! এত বড় আঘাত! সামাল দেওয়া অত্যন্ত শক্ত কাজ। একেবারেই ভেঙে পড়লাম। অসম্ভব অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। সেই বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে বেশ কয়েকটি বছর লেগে গেল।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—কবিতায় এটি লিখলেও নিজে কখনো মিছিলে যাননি হেলাল হাফিজ। ছবি: জিয়া ইসলাম‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—কবিতায় এটি লিখলেও নিজে কখনো মিছিলে যাননি হেলাল হাফিজ। ছবি: জিয়া ইসলামহাসান: সে সময় কি আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন?
হেলাল: হ্যাঁ। ভেবেছিলাম। একাধিকবার আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারিনি। তবে এই প্রবণতা একসময় প্রায় গ্রাস করে ফেলেছিল আমাকে।

হাসান: এই যে কয়েকবার আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার কথা বললেন, তার সবই কি নারীর কারণে?
হেলাল: তা বলতে পারো। অলমোস্ট সে কারণেই। আত্মহত্যা যে করতে পারলাম না, তার পেছনেও বড় দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সবিতা মিসট্রেসের অবদান। তিনি বিদুষী স্কুলশিক্ষিকা, নেত্রকোনায় আমার শিক্ষক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার মা-ছেলের মতো সম্পর্ক ছিল প্রথমটায়, পরে সেটা বন্ধুত্বের সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়। তাঁর দীক্ষা ও রুচিতে আমার মানস গঠিত হয়েছিল। সেটা একটা শক্তি। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো, কবিতার জন্য মানুষের যে ভালোবাসা-আদর আমি পেয়েছি, তার ইতিবাচক প্রভাব। এই দুই কারণ না থাকলে আমি মরেই যেতাম; অথবা অথর্ব, সাদামাটা জীবন যাপন করতাম।

হাসান: আর কোনো প্রেম? আর কোনো গোপন বেদনার কাহিনি?
হেলাল: হ্যাঁ। আরও আছে। নেত্রকোনায় আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র, তখন শঙ্করী বলে অসামান্য সুন্দরী এক মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল আমার। সে ছিল আমার সহপাঠী। পরস্পরকে আমাদের ভীষণ ভালো লাগত। ওর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি হতে পারতাম প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক ক্লাসের সময়। বায়োলজি ক্লাসের জুয়োলজি ও বোটানির প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস যখন হতো, শিক্ষকেরা বিশেষ থাকতেন না। এ সময় মেলামেশার সুযোগ হতো বেশ। অসম্ভব সুন্দরী তরুণী শঙ্করীর প্রেমে হাবুডুবু খেত কলেজের অনেকেই।

সন্ধ্যায় প্রতিদিন আমরা প্রচলিত পথে না গিয়ে রেললাইন ধরে পাশাপাশি হাঁটতাম। সে এক আশ্চর্য রোমান্টিক সময় গেছে আমাদের। একদিনের কথা বলি। বোটানির প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস চলছে। রক্তজবা ফুল ডিসেকশনের জন্য দেওয়া হয়েছে। জবা ফুলের দুটি কেশর থাকে। একটি পুং কেশর, অন্যটি স্ত্রী কেশর। আমার পাশের টেবিলেই ছিল শঙ্করী। আমি ওকে বললাম, শঙ্করী, পুং কেশর কোনটা, দেখিয়ে দাও তো একটু। শঙ্করী একটু মুচকি হেসে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্তিত্ব নিয়ে আমাকে বলল, তোমার মতো ভীরুকে পুং কেশর চিনিয়ে দিয়ে আমার কী লাভ?

সেই শঙ্করী পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়েছে। ডাক্তার হয়েছে। আমিও ডাক্তারি পড়তে চেয়েছিলাম। হয়নি। শঙ্করীকে পাওয়া হলো না আর। আমি চলে এসেছি কবিতার পথে। ওই যে হেমন্তের একটা গান আছে না, ‘আজ দুজনার দুটি পথ ও গো দুটি দিকে গেছে বেঁকে...।’
হাসান: কবিতা ও নারী—কে বেশি রহস্যময়ী?
হেলাল: দুটোই খুব রহস্যময়ী। একজনের প্রাণ আছে। কবিতা যদি শিল্পগুণসমৃদ্ধ হয়, তাহলে সেটারও প্রাণ থাকে। নারীকে আমি শুধু নারী হিসেবেই দেখতে চাই না, তাকে দেখতে চাই মানুষ হিসেবে। আবার এ কথাও তো সত্য যে নারীরও পুরুষকে দরকার। নারীরও তো আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন আছে পুরুষকে নিয়ে। তারও গভীর, তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে স্পর্শ করার, ঘ্রাণ নেওয়ার। দুই তরফেই এক রকম চাহিদা।
আমার কবিতাপুঞ্জে এত যে আকুতি, এত প্রেম তার সিংহভাগ কিন্তু বিচ্ছেদ-বিরহকেন্দ্রিক। এই বিষয়টা শুধু আমার কবিতায়ই মিলবে না, আমার যাপিত জীবনেও একই ধরনের চিত্র তুমি পাবে। তিন বছর বয়সে যখন মাকে চিরতরে হারালাম, সেটার আফটার অ্যাফেক্ট বুঝতে বুঝতে অনেকটাই সময় লেগে গেল আমার। দুঃখ-বিরহ-বিষাদ কিন্তু নিছক কান্নাকাটির বিষয় নয়, এটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করারও বিষয়। প্রকৃত শিল্পী ও কবি তিনিই, যিনি এই কষ্ট-দুঃখ-বিরহ-বিচ্ছেদকে মহৎ শিল্পে রূপান্তরিত করতে পারেন। শিল্পের জন্য বিরহ কিন্তু খুবই জরুরি।
হাসান: আপনার প্রিয় জিনিসগুলো সম্পর্কে জানতে চাই—প্রিয় পোশাক, রং, খাবার, ফুল, মাছ ইত্যাদি।
হেলাল: আমার প্রিয় পোশাক প্যান্ট-শার্ট। পাঞ্জাবি প্রায় পরিই না, মাঝেমধ্যে পরা হয়। আমি ভাটি অঞ্চলের মানুষ, নেত্রকোনায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। প্রিয় খাদ্য হলো ভাত-মাছ, শুঁটকি। ফলের মধ্যে কলা আমার বেশ প্রিয়। প্রতিদিনই খাওয়া হয়। এই ফল সারা বছর পাওয়া যায়। আম-কাঁঠালও বেশ প্রিয় আমার।
কলা খাওয়ার একটা সুবিধা আছে। সেটা কী, জানো, হাত ময়লা হয় না। হাত ধুতেও হয় না। ফলের মৌসুমে সুহৃদ-অনুরাগীরা আমার জন্য কাঁঠাল নিয়ে আসেন। ঢাকার বাইরে থেকেও আনেন কেউ কেউ। সুহৃদ, সহকর্মী বন্ধুরা, বউমায়েরা প্রায়ই তাঁদের বাড়িতে রান্না করা আনাজ-তরকারি আমার জন্য নিয়ে আসেন। ও হো, বেগুনভর্তা আমার বড্ড পছন্দের। আর মাছের কথা বলছ? সব মাছই ভালো লাগে। মাগুর মাছের কথা বলি। বেশ প্রিয়। ইলিশও পছন্দের। দেশি কই মাছ খেতে ভালো লাগে। কাঁঠালের বিচি দিয়ে শুঁটকিভর্তা পছন্দ করি ভীষণ। মাষকলাইয়ের ডালও বেশ ভালো লাগে।
আমার প্রিয় রং হলো নীল। বেদনার রং তো। জীবনের আনন্দ ও বেদনার আবেগের সবকিছুই খুঁজে পাই নীলের মধ্যে। লাল রংও ভীষণ ভালো লাগে। এটা দ্রোহের রং, বিপ্লবেরও।
প্রিয় ফুল হচ্ছে কচুরিপানার ফুল। এটা কেন প্রিয়, তারও একটা মজার ইতিহাস আছে। আগেই বলেছি, আমার প্রিয় মানুষ ছিলেন সবিতা মিস্ট্রেস। আমার মতো মাতৃহীন এক বালককে তিনি মাতৃস্নেহ দিয়েছেন। তাঁর প্রেমিক ছিলেন হক ভাই। নেত্রকোনা শহরে মগরা নদীর ওপারে থাকতেন সেই হক ভাই। গোপনে ওঁরা দেখাসাক্ষাৎ করতেন। হক ভাই তাঁর প্রেমিকার জন্য প্রতিদিন একটা করে কচুরিপানার ফুল নিয়ে আসতেন। একদিন সবিতা মিস্ট্রেস বললেন, ‘এখন থেকে দুটো করে ফুল আনবে। একটা আমার জন্য, আরেকটা হেলালের জন্য।’ হক ভাই তা-ই করতে থাকলেন। কচুরিপানার ফুলের প্রতি সেই প্রিয়তা আমার আজও রয়ে গেছে।
যৌবনে হেলাল হাফিজ, ১৯৭৩।  ছবি: শামসুল আলম আলমাজীযৌবনে হেলাল হাফিজ, ১৯৭৩। ছবি: শামসুল আলম আলমাজীহাসান: কবি হওয়ার জন্য, ভালো কবিতা লেখার জন্য কী কী গুণাবলি থাকা আবশ্যক বলে আপনি মনে করেন? একটি কবিতা কীভাবে মানুষকে নাড়া দেয়?
হেলাল: কবিতা জন্মগতভাবে পাওয়া বিশেষ একটা বিষয়। কেউ কেউ এটা নিয়েই জন্মায়। অগ্রজ বা নিকটাত্মীয় কেউ লেখক বা শিল্পী থাকলে প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রে তা সহায়ক হয়। প্রতিভার পরিশীলন, লালন, বিকাশের জন্য পড়াশোনার বিকল্প নেই। কবিতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি মাধ্যম। কোন কবিতা কাকে কখন নাড়া দেবে, সাড়াজাগানিয়া হবে, তা আঁচ করা মুশকিল। এটা খুবই ট্রিকি একটা ব্যাপার।

হাসান: প্রধানত তরুণ-তরুণীরাই আপনার কবিতার পাঠক ও অনুরাগী। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের বর্তমান সময়ে হালফিল তরুণদের মধ্যে কবিতার প্রতি টান বা প্রীতি কি হ্রাসমান, এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
হেলাল: এখন তো কম্পিউটার, অন্তর্জাল ও ফেসবুকের যুগ। হ্যাঁ, বই পড়া কমেছে আগের তুলনায়। ধরো, ফেসবুকে আমি একটি কবিতা পোস্ট করলাম। মুহূর্তের মধ্যে গোটা বিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়ছে। আবার ফেসবুকের দুর্বলতাও আছে। বড় দুর্বলতা হলো, দ্বিতীয় বা তৃতীয় কেউ সম্পাদনা করার নেই। নান্দনিকতার একটা ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে সে কারণে। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের সুরুচির দ্বারা শাসিত না হন, তবে সেটা কুৎসিত আকার ধারণ করে।

এ-ও সত্য, কম্পিউটার, ফেসবুক পুরো দুনিয়াকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। বড়ই বিস্ময়কর অগ্রগতি। ধরো, নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিতে তুমি জানতে চাইলে অমুক বইয়ের অমুক পৃষ্ঠাটা আমি দেখতে চাই। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সেটা পেয়ে যেতে পারো তুমি। এই যে চমৎকার সুবিধা, এটা এনে দিয়েছে ফেসবুক বা অন্তর্জাল। এই অন্তর্জাল যেমন ওপরে ওঠার সিঁড়ি, তেমনি নিচে নামারও সিঁড়ি। কথা হলো, কে কীভাবে ব্যবহার করছে, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করে।

এখানে আতঙ্কের কথাও রয়েছে। একেবারে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে বা মেয়ে, তাদের জন্য এই সুযোগ মারাত্মক তো বটেই। এসব ডিভাইস তাদের হাতে নিশ্চিন্তে তুলে দেওয়া যেমন খানিকটা বিপজ্জনক, তেমনি ওদের একেবারে বঞ্চিত করে রাখাটাও বোকামি। অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট যদি না দাও, তাহলে ওরা পিছিয়ে পড়বে। অনেকে তো মোবাইলে পড়াশোনাও করে থাকে আজকাল। একটা ছেলে বা মেয়ে যখন বাড়ির আলাদা রুমে থাকে, তার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই রয়েছে।
হাসান: এই সংকট মোকাবিলার উপায়টা কী তাহলে?
হেলাল: উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মারধর করা যাবে না। তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে। ওদের প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত করা মানে হলো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। দেখো, মুঠোফোন দারুণ উপকারীও। বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজখবরও তরুণ-তরুণীরা এর মাধ্যমে নিতে পারছে। আবার এই মোবাইল দিয়ে সাবালক মানুষও আজেবাজে কাজ করছে। তাদের সংখ্যাই হয়তো বেশি। তারপরও এ বিষয়ে শেষ কথা হলো, হালফিল দুনিয়ায় আইটি আমাদের এক ধাক্কায় চার-পাঁচ শ বছর এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে সহজ, সুন্দর ও সৎভাবে আইটি ব্যবহার করতে পারলে সেটা দেশের জন্য সেটি মঙ্গলজনক হবে বলেই আমি মনে করি।
হাসান: সম্প্রতি দুই দফা হাসপাতাল থেকে ফিরলেন। বেশ ধকল গেছে। এখন মৃত্যুচিন্তা কি আসে আপনার মধ্যে?
হেলাল: এ বছরের মে মাসে ল্যাবএইড হাসপাতালে যখন প্রথম দফায় গেলাম, এ রকম একটা ধারণা হয়েছিল যে আর বোধ হয় ফিরতে পারব না। খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে মনে পড়েছিল আমার শৈশব, কৈশোর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে জাতীয় প্রেসক্লাবকেন্দ্রিক যে জীবন আমি যাপন করে আসছি, সবকিছু মনে পড়ছিল। প্রেসক্লাবে তিন বেলা আমি আহার করি। জীবনের খুব লম্বা একটা সময় এখানে কাটালাম।
তবে এখন মনে হয়, বিদায়ের সময় তো একপ্রকার হয়েই গেছে। দেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭১-৭২ বছর। সেটা তো আমার হয়েই গেছে। যদি বিদায় নিতেই হয়, বিধাতা, প্রকৃতি কাউকে দোষারোপ করার কিছু নেই। মৃত্যু নিয়ে আমার বিশেষ কোনো ভয় নেই। তবে কথা হলো, কে অত সহজে যেতে চায়? একরকম অতৃপ্তি থাকেই। মনে হয়, জীবন যদি আরেকটু দীর্ঘায়িত হয়, বেশ হয় তাহলে। আরও একটুখানি সময় যদি থেকে যাওয়া যায়, মন্দ হয় না। তবে হ্যাঁ, আমার কোনো অতৃপ্তি-অনুতাপ নেই। সত্য বটে, সময়ের অপচয় করেছি। সেটা না হলে হয়তো আরও ভালো হতো। যা গেছে, গেছেই। গন ফর এভার।
এখন যে কদিন পরমায়ু আছে, মোটামুটি সুস্থ থাকতে পারলেই ভালো—এটাই সামান্য চাওয়া। শরীর অনেকটাই ঠিক নেই। শরীরের অনেক অর্গান তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। চোখ নিয়ে গুরুতর সমস্যা রয়েছে। ভালো লেখার জন্য অনেক পড়াশোনা করতে হয়। চোখের কারণে সেটা পারি না। আরও একটা উপলব্ধি হয়েছে আমার, ৫০-৫৫ বছর পর্যন্ত একার জীবন, ইটস অলরাইট। তারপর সঙ্গী লাগে। এই যে প্রয়োজনের কথা বলছি, সেটা শুধু শরীরের চাহিদার কারণেই নয়। একজন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য বন্ধু সব সময় পাশে থাকা খুবই প্রয়োজন। সেই অভাবটা অনুভব করি। আর আমি যেহেতু হোটেলে বসবাস করি, সুতরাং আমার অসুবিধাটা একটু বেশি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় একজন বন্ধুর পাশে থাকাটা জরুরি। বাট, ইটস টু লেট! এখন অবশ্য কিছুই আর করার নেই।
হাসান: ধরুন, আপনাকে বাংলাদেশের সর্বময়, একক, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব দেওয়া হলো, কোন কাজটাকে অগ্রাধিকার দেবেন তখন?
হেলাল: হা হা হা, এমন ক্ষমতা আমি নেবই না। আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় আলস্য, নারীর চেয়েও প্রিয়। ক্ষমতা যদি নিইও, রাষ্ট্রের বারোটা বাজবে। একই সঙ্গে আমারও। এটা আসলে আমার কাজই নয়। দেখলে না, সারা জীবনে একটা বই লিখেই কাটিয়ে দিলাম।

যখন লিখি, তখন আর কিছু খেয়াল থাকে না

রিজিয়া রহমানের এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৬ সালে। দেশে তখন উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনাবশত ঘটছিল নানা ঘটনা। সেই সূত্রে এল তাঁর উপন্যাস আলবুর্জের বাজ–এর কথা, যেখানে অনেক আগেই তিনি লিখেছেন ধর্মীয় উন্মাদনার বিষয়ে, ওই উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনেই শুরু হলো আলাপন। পরে ধীরে ধীরে ধর্ম ও সংস্কৃতি ছুঁয়ে সে কথা ছড়িয়ে গেল তাঁর লেখার জগতেও। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বদরুন নাহার
বদরুন নাহার: আলবুর্জের বাজ যখন লেখেন, সেই সময়টার কথা মনে আছে?
রিজিয়া রহমান: লেখার প্রথম দিকে ঘরের কাজগুলো দেখতাম আর লিখতাম। শেষের দিকে বের হইনি ঘর থেকে। বুয়া আছে, রান্না করে। টেবিলে খাবার দিয়ে দিত, আমার ছেলে-বউ—ওরা নিজেরাই খেয়ে নিত। আমাকে ডেকে বিরক্ত করত না। হয়তো বিকেলে উঠলাম, ধুমধাম করে সন্ধ্যায় গোসল করে আবার লিখতে বসতাম। যখন লিখি, তখন আর কিছু খেয়াল থাকে না। এই উপন্যাসে তো আছে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারস্যাপার। ওইখানে সবচেয়ে অসুবিধা হয়েছিল ইরাকের বাগদাদ শহরের বর্ণনা লিখতে। খুবই কষ্ট হয়েছিল। এ বই, সে বই, হেন-তেন কিছুতেই খুঁজে পাই না। খুব টেনশনে আছি। মনে মনে ভাবি বাগদাদ এ রকম হবে, ও রকম হবে। এরপর একদিন স্বপ্নে দেখি বাগদাদের রাস্তায় হাঁটছি! মানে বাগদাদ এত বেশি মাথায় ঢুকেছে যে আমি বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। তো পরের দিন উঠে কবি রুবী রহমানকে বললাম, ‘রুবী, আমি খুব বিপদে ছিলাম। বাগদাদ শহরকে কিছুতেই মাথায় আনতে পারছিলাম না। কালকে স্বপ্নে আমি বাগদাদ দেখেছি।’ আচ্ছা, বইটা পড়েছ কি? আলবুর্জের বাজ?
বদরুন: জি, পড়েছি।
রিজিয়া: আলবুর্জ পর্বতমালা যেটা, নর্দান মাজেন্দার। ওই জিনিসটা দেখার ইচ্ছা আমার। যেটাতে ওদের ঘাঁটি ছিল। কেমন এলাকাটা? ওখানে ঘরবাড়ি, গ্রাম আছে কি না? ইরানি টেলিভিশনে খুব ভালো ভালো সিনেমা দেখাত। আমি তা দেখতাম। হঠাৎ একদিন দেখি যে নর্দান ইরান। ইরানের যে পাহাড়ি এলাকা আছে, ওটা দেখাচ্ছে। আমি এটার জন্য পাগল হয়ে ছিলাম। আমার মাথার ভেতর কেবল ছিল ওই আলবুর্জ পবর্তমালা। বাগদাদ আর দামেস্ক। দামেস্ক আমি পেয়েছি ইবনে বতুতা ও মার্কো পোলোর বইয়ে। কিন্তু আলবুর্জ পর্বত পাচ্ছিলাম না। তো টিভিতে দেখলাম একদম রঙিন ছবি! উঁচু পর্বত যার ঢাল বেয়ে, নিচুতে গ্রিন ভ্যালি। দুম্বা চরছে, ছাগল চরছে, বাড়ি আছে।
বদরুন: আলবুর্জের বাজ–এ ভিন্ন মতবাদের কারণে যে দল গঠন, বিষয়টি কি শুধুই আপনার কল্পনা নাকি ইতিহাস থেকে নিয়েছিলেন?
রিজিয়া: অবশ্যই ইতিহাসের। ভিত্তিটা তো ইতিহাসের। আমার আবার বই পড়ার খুব নেশা। ইচ্ছা ছিল মার্কো পোলোর বাংলা বইটা না পড়ার, ইংরেজি বইটাই পড়তে চাই। ওটা আমার ছেলে কিনে এনেছিল। ওই বইটা পড়তে পড়তে এক জায়গায় দেখলাম মার্কো পোলো লিখেছেন, আলবুর্জ পর্বতমালায় একটা ঘাঁটি ছিল। আশপাশের গ্রাম থেকে ওই কম বয়সী—১২ থেকে ২০–এর মধ্যে যাদের বয়স—স্বাস্থ্যবান ওই ছেলেপেলেকে ধরে আনা হতো। ওদেরকে প্রশিক্ষণ দিত, হাশিশের নেশা ধরাত। এভাবে ওদের তৈরি করত।
বদরুন: সারা বিশ্বে এখন মুসলমানদের অনেকেই উগ্র পন্থার দিকে চলে যাচ্ছে...
রিজিয়া: ওটা ওসামা বিন লাদেনই শুরু করেছিল। এই উগ্রপন্থার আবির্ভাবও তো আরবে। ওসামা বিন লাদেনই এটা সামনে এনেছিল। পরে তা ছড়িয়েছে। আর এখন তো এটা একটা অদ্ভুত ফ্যান্টাসির মধ্যে চলে গেছে।
বদরুন: ধর্মীয় উগ্রবাদের যে সমস্যা, তা তো মুসলমানদের দিয়েই করানো হচ্ছে।
রিজিয়া: সারা পৃথিবীতে এখন যে জাতীয়তাবাদ বা উগ্র জাতীয়তাবাদ—এসব সেই হিটলারের সময় থেকে চলে আসছে। তারপর আন্তর্জাতিকতাবাদ এটা হলো মানুষের স্লোগান। সেটাও তো বহু বছর হয়ে গেল। এখন আবার সবাই পেছনের দিকে ফিরছে। হ্যাঁ, পৃথিবীটা আবার জাতীয়তাবাদের দিকে ফিরে যাচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। আসলে আমরা ভাষাভিত্তিক জাতি। সেই হিসেবে আমরা নিজেদের বাঙালিরূপে ব্যাখ্যা করি। আসলে ভাষাই আমাদেরকে তৈরি করেছে। যেহেতু আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা, বিভিন্ন বর্ণের লোক মিলেই তো বাংলাদেশ।
বদরুন: আপনার বং থেকে বাংলায় এই বিষয়গুলো আছে। ইসলাম এখানে যে এল, রয়েছে সে প্রসঙ্গও।
রিজিয়া: আমার কথা হলো, নানা দেশে নানান জাতি এসেছে, নানান ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে। এখন এগুলো এত বছরে, হাজার বছরে মিশ্র সংস্কৃতি হয়ে গেছে।
বদরুন: আমরা কি সুনির্দিষ্ট কোনো সংস্কৃতিতে পৌঁছাতে পেরেছি বলে মনে করেন?
রিজিয়া: অবশ্যই পৌঁছেছি। ষাট দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত। তবে এই সময়ে এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কৃতির যে ধরন–ধারণ, তা কিন্তু এবং আমদানীকৃত একটা সংস্কৃতি।
বদরুন: এখন আমরা পুরোপুরি বাঙালি সংস্কৃতিতে নেই।
রিজিয়া: সেটা হচ্ছে এই যে গ্লোবালাইজেশন বা মুক্তবাণিজ্য। এখানে আমদানি করা সংস্কৃতি, হাইব্রিড কালচার ইচ্ছে করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সারা পৃথিবী এক ভাষায় কথা বলে। ওয়ালটন র‌্যালি বলে গিয়েছিলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখছি যে একদিন সারা পৃথিবী আমেরিকায় বসে ইংরেজি ভাষায় কথা বলবে।’ তখন আমেরিকা মাত্র ইংরেজদের দলছুট হয়েছে। ওরা প্রথম রেড ইন্ডিয়ানদের ভাষাকে গ্রাস করল।
এখন কথা হচ্ছে আমাদের মূল পরিচয় নিয়ে। স্পষ্ট করেই বলি, আমাদের আত্মপরিচয় আমরা ধরতে পারছিলাম না। তোমাকে একটা ঘটনা বলি, তাহলে বুঝতে পারবে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত বার্ষিকীতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটা প্রবন্ধ পড়ার জন্য। বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা’। সেখানে আমি সচেতনভাবেই বলেছিলাম, আপনারা দেড় শ বা এক শ বছর ধরে যে রবীন্দ্রচর্চা করছেন, তা পরিপূর্ণভাবে একাডেমিক। তাঁর লেখা, তাঁর লেখার শৈলী, তাঁর কবিতা—এ রকম আরকি। কিন্তু বাংলাদেশের রবীন্দ্রচর্চা একেবারে অন্য রকম। তা এসেছেও ধীরে। এর কারণ হলো, ব্রিটিশ আমলে আমরা ছিলাম মুসলমান। তারপর হলো কি, সবাই বলা শুরু করল বাঙালি মুসলমান। পরে হলো পাকিস্তান। আমরা হয়ে গেলাম পূর্ব পাকিস্তানি। তখন আমরা লিখতাম, ‘উই আর ইস্ট পাকিস্তানি’। এরও পর ১৯৭১–এর যুদ্ধের পর আমরা বাঙালি হয়েছি। তো এত দেরিতে যখন বাঙালি হয়েছি, রবীন্দ্রচর্চা তো দেরিতেই শুরু হবে। আসলে আমাদের রবীন্দ্রনাথ হচ্ছে অন্য রকম। কারণ, আমরা অনেক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি।
বদরুন: আপনার বং থেকে বাংলা আলবুজের্র বার্জ—এই দুই উপন্যাসের স্থান ও কাল ভিন্ন হলেও দুটোতেই মুসলমানের ইতিহাস আছে। আবার শওকত আলীর উপন্যাস প্রদোষে প্রাকৃতজন–এ–ও ইতিহাস আছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
রিজিয়া: না। বাংলাদেশে মুসলমানরা এভাবে আসেনি। এখানে ইসলাম ধর্মটাই এসেছে অন্যভাবে। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি কিন্তু এসেছে পশ্চিম বাংলা পর্যন্ত, পূর্ববঙ্গে সে আসেনি। তার আগে কিছু পাঠান এসেছিল, দক্ষিণ ভারত থেকে আর কিছু মোঙ্গল এসেছিল, কিন্তু থাকেনি। শায়েস্তা খান এসে দলবল নিয়ে চলে গেছে। তখন যত সুবাদারই এসেছে, তারা থাকেনি। এই দেশকে তারা পছন্দ করেনি, ভালোও বাসেনি। তারা প্রচুর আয়-ব্যয়, টাকাপয়সা কামাই করে চলে গেছে।
বদরুন: আপনার বং থেকে বাংলা ও শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন—এই দুই উপন্যাসের বিষয়বস্তু ইতিহাস। দুটিতেই কাছাকাছি সময়ের একটা আঁচ আমরা পাই...।
রিজিয়া: না, আমার উপন্যাসের মধ্যে অনেক অধ্যায় আছে। প্রথম যে মানবগোষ্ঠী, সেটাকে আমি নিয়েছি। তারপর আমি একটা পিরিয়ড নিয়েছি, কিন্তু প্রদোষে প্রাকৃতজন–এ শওকত আলী নিয়েছেন চর্যাপদের সময়টা। যে চর্যাপদের সময়টা আমার বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে এসেছে, উনি সেটা নিয়েই তাঁর উপন্যাস লিখেছেন। ওটা শশাঙ্কর সময়। শশাঙ্কর পরে বল্লাল সেন—ওই সময়। উনি আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি তো বং থেকে বাংলা লিখেছেন, আমি লিখতে চাচ্ছি চর্যাপদের সময় নিয়ে। চর্যার সময় নিয়ে সেলিনাও (সেলিনা হোসেন) লিখেছে।
বদরুন: নীল ময়ূরের যৌবন।
রিজিয়া: হ্যাঁ। তো, শওকত আলী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি সংলাপগুলো কীভাবে দিয়েছেন? আমি তাঁকে বললাম, ওই ভাষা তো আমি অত ভালো জানি না। আর ওই বাংলায় লিখলে পাঠক একটুও পড়বে না—এসব ভেবে আমি চলতি বাংলা ভাষায় সংলাপ লিখেছি। উনি বললেন, ভাষা নিয়ে আমি খুব সমস্যায় ছিলাম। এরপর আমি বললাম, আপনি লিখুন।
 বদরুন: আঞ্চলিক ভাষায় লেখার প্রসঙ্গে অনেকেই বলেন, এতে পাঠকের পড়তে সমস্যা হয়। কিন্তু চলতি বাংলায় লেখা হয়েও যদি কিছু কিছু সংলাপে সংমিশ্রণ ঘটে, তাহলে কী ঘটে?
রিজিয়া: আমি যেটা করেছি, আবহাওয়াটা আনার জন্য ওটা ব্যবহার করেছি। যেমন ধরো, আলবুর্জের বাজ। এখানে বহু ফারসি, তুর্কি ও আরবি শব্দ আমি ব্যবহার করেছি। যেগুলো জানি আর যেগুলো আমাদের জানা নেই, এমন কিছু তুর্কি শব্দ ফুটনোট দিয়ে তারপর দিয়েছি। তারপর শায়েস্তা খানের সময়কে যেখানে ব্যবহার করেছি, সেখানে অনেক ফারসি শব্দ দিয়েছি। আলবুজের্র বাজ–এতুকি, ফারসি আর আরবি শব্দ বেশি ব্যবহার করেছি।
বদরুন: আপনার কি ভাষাগুলো আগে থেকে রপ্ত ছিল? এই ধরেন, তুর্কি ভাষা?
রিজিয়া: না। তুর্কি ভাষা আমি জানি না। কিন্তু এসব খুঁজলেই অর্থ পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার মধ্যেও অনেক শব্দ মিশে আছে। তাই সমস্যা হয়নি।

কম সময়ের মাঝে বেশি কাজ করার জন্য ৫ পরামর্শ

একেক মানুষের কাজ করার ধরন একেক রকমের। কেউ ধীরে ধীরে কাজ করেন, আবার কারও সবকিছুতেই তাড়াহুড়ো। কিন্তু সবাই চায় ভালো মানের কাজ করতে। কাজ ঠিকঠাক না করলে কি আর অফিসে টিকে থাকা যাবে? সে ক্ষেত্রে কম সময়ে বেশি কাজ করার ইচ্ছা সবারই থাকে। কিছু কৌশল অবলম্বন করলে কম সময় ব্যয় করেই বেশি পরিমাণ কাজ করা যায়। আসুন জেনে নেওয়া যাক তেমনই কিছু কৌশল:
১. বসের চাওয়া কী, জেনে নিন বিস্তারিত
কোনো কাজ যখন আপনাকে দেওয়া হবে, তখন সেটি কেমন হতে হবে, তার বিস্তারিত জেনে নিন শুরুতেই। হয়তো অফিস আপনার কাছে পাওয়ার পয়েন্টে একটি উপস্থাপনা চাইতে পারে, আবার না-ও চাইতে পারে। কখনো হয়তো সর্বোৎকৃষ্ট মানের কাজ প্রয়োজন হয়, আবার কখনো শুধু চলনসই হলেই চলে। হয়তো আপনি ভাবছেন, দিতে হবে ওই নির্দিষ্ট কাজের বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা। কিন্তু আদতে হয়তো প্রারম্ভিক একটি খসড়া হলেই বসের চলে। এসব বিষয় মাথায় রেখে তাই শুরুতেই জেনে নিন কাজটা কেমন হতে হবে। তাহলে শুরু থেকেই নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন আপনি। ফলে অযথা অপ্রয়োজনীয় কাজ করে সময় নষ্ট হবে না এবং কম সময়েই সমাধা হবে নির্ধারিত কাজ।
২. ব্যবহার করবেন আগের কিছু
সময় বাঁচানোর সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে আগের কাজের অব্যবহৃত অংশ ব্যবহার করা। অনেক সময়ই দেখা যায়, আগের কাজের সূত্র ধরেই হয়তো নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আগের কাজের কিছু অংশ পুনরায় ব্যবহার করা যায়। তবে অবশ্যই তা মৌলিক পন্থায় ব্যবহার করতে হবে। যেমন: আগের ই-মেইল, প্রেজেন্টেশন, প্রশিক্ষণ, প্রস্তাব প্রভৃতির অনেক অংশ পরবর্তী সময়েও প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করে ব্যবহার করা যায়।
৩. তালিকায় থাক সবকিছু
কাজের শুরুতেই একটি রুটিন করে নেওয়া যেতে পারে। যে কাজটি আপনাকে করতে দেওয়া হয়েছে, তা সমাধা করতে যা যা করা দরকার, সেগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে নিন। তাহলে ধাপে ধাপে কাজ করা সহজ হবে। আবার পুরো কাজের চাপও একসঙ্গে পড়বে না। বস জিজ্ঞেস করলে চটজলদি বলেও দিতে পারবেন কাজের অগ্রগতির খবর।
৪. সময় বেঁধে কাজ করুন
কম সময়ে বেশি কাজ করতে হলে অবশ্যই সময় বেঁধে কাজ করতে হবে। পুরো কাজের কোন অংশের জন্য কতটুকু সময় বরাদ্দ রাখবেন, তা ঠিক করে নিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে, ওই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই যেন কাজটি শেষ হয়। তবেই দেখা যাবে, পুরো কাজের পেছনে ব্যয় করা সামগ্রিক সময় কমে আসবে।
৫. চাই অখণ্ড মনোযোগ
কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অমনোযোগিতা। যদি কোনো কাজ করার সময় মনোযোগ না থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই তা শেষ হতে সময় বেশি লাগে। আর প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে তো মনোযোগ ধরে রাখাই কঠিন। এই ফেসবুকে কেউ পোক করল, তো আরেকজন টুইটারে করল কমেন্ট। তাই জরুরি কাজ করার সময় কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্মার্টফোনটিকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন। যখনই মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করবেন, তখনই তা দ্রুত শেষ হবে। সুতরাং মনোযোগ ধরে রাখার কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ ও অন্ট্রোপ্রেনার ডটকম

কম্পিউটার সফটওয়্যার কি?

কম্পিউটার সফটওয়্যার হলো কোনো কাজের কতকগুলো সুশৃঙ্খল নির্দেশ যার ভিত্তিতে হার্ডওয়্যার সক্রিয় হয়ে সংশ্লিষ্ট কাজটি সম্পন্ন করে থাকে। অর্থাৎ কোনো কাজের উপযোগী করে তা সম্পাদনের নির্দেশ দেওয়ার নামই হলো সফটওয়্যার। অন্যভাবে বলা যায়, সফটওয়্যার হলো কতকগুলো প্রোগ্রামের সমষ্টি যা হার্ডওয়্যারকে সচল করে ব্যবহারকারীর সমস্যা সমাধান করে থাকে। এক কথায় হার্ডওয়্যার কম্পিউটারের দেহ হলে সফটওয়্যারকে কম্পিউটারের প্রাণ বলা যেতে পারে।


কম্পিউটার সফটওয়্যারের উদাহরণ :
১. ওয়ার্ড প্রসেসিং
২. স্প্রেডশীট প্রোগ্রাম
৩. ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম
৪. গ্রাফিক্স ও ডেস্কটপ পাবলিশিং
৫. ই-মেইল
৬. ওয়েব ব্রাউজ
৭. ভিস্তা
৮. এমএস পাওয়ার পয়েন্ট
৯. উইন্ডোজ ২০০৩
১০. উইন্ডোজ এক্সপি ইত্যাদি।
 
#সফটওয়্যার #উইন্ডোজ_এক্সপি  #গ্রাফিক্স

Computer কি? কম্পিউটারের কাজ, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা এবং ব্যবহার।


%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25AA%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%2589%25E0%25A6%259F%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B0
  Computer শব্দটির সাধারণ অর্থ হচ্ছে গণক যন্ত্র। ল্যাটিন শব্দ Compute থেকে ইংরেজী Computer শব্দের উৎপত্তি। Compute শব্দটির অর্থ গণনা বা হিসাব নিকাশ করা। কম্পিউটারের সাহায্যে মূলতঃ যােগ, বিয়ােগ, গুণ, ভাগ ইত্যাদি কার্যাবলী সম্পাদন করা যায়। কিন্তু বর্তমান যুগে কম্পিউটারের বহুমুখী ব্যবহারের ফলে কম্পিউটারের সংঙ্গা অনেক ব্যাপকতা লাভ করেছে। কোন সীমিত সংঙ্গা দিয়ে আর কম্পিউটারকে গন্ডীবদ্ধ করা যায় না। কম্পিউটার সেকেন্ডের মধ্যে কোটি কোটি হিসাব-নিকাশ করতে পারে। কম্পিউটারে কাজের গতি হিসাব করা হয় ন্যানোসেকেন্ডে। ন্যনোসেকেন্ড হচ্ছে এক সেকেন্ডের একশত কোটি ভাগের একভাগ সময় মাত্র। কম্পিউটারের ভিতরে অনেক বর্তনী থাকে। ইলেকট্রন প্রবাহের মাধ্যমে কম্পিউটারের যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত হয়। ইলেকট্রনিক সংকেতের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে কম্পিউটার ল্যাংগুয়েজ বা কম্পিউটারের ভাষা। কম্পিউটারের বোধগম্য এ ভাষার মাধ্যমে কম্পিউটারে যে নির্দেশ দেয়া হয় তারই ভিত্তিতে কম্পিউটার ফলাফল প্রদান করে। কম্পিউটারের এ নির্দেশাবলিকে বলা হয় প্রোগ্রাম। প্রোগ্রাম ছাড়া কম্পিউটার একটি জড় পদার্থ ভিন্ন আর কিছু নয়। উপযুক্ত প্রোগ্রামের ফলে কম্পিউটার জড় পদার্থ হতে গাণিতিক শক্তিসম্পন্ন বুদ্ধিমান যন্ত্রে পরিণত হতে পারে।

 কম্পিউটারের কাজ 
কম্পিউটারের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিচে উল্লেখ করা হলাে
১. সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে ব্যবহারকারী কর্তৃক তৈরি প্রােগ্রাম (Programs) কম্পিউটার গ্রহণ করে মেমােরিতে সংরক্ষণ করে এবং ব্যবহারকারীর নির্দেশে কম্পিউটার প্রােগ্রাম নির্বাহ (Execute) করে।
২. কী-বাের্ড, মাউস, জয়স্টিক, ডিস্ক ইত্যাদির মাধ্যমে কমপিউটার ডেটা (Data) গ্রহণ করে।
৩. ডেটা প্রক্রিয়াকরণ (Process ) করে।
৪. মনিটর, প্রিন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে কম্পিউটার ফলাফল প্রকাশ করে।

 কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য 
বিভিন্ন যন্ত্রের মতাে কম্পিউটারেরও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উল্লেখযােগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলাে।
১. দ্রুতগতি (High speed)
২. নির্ভুলতা (Correctness)
৩. সূক্ষ্মতা (Accuracy)
৪. বিশ্বাসযােগ্যতা (Reliability)
৫. ক্লান্তিহীনতা (Dilligence)
৬. স্মৃতিশক্তি (Memory)
৭. স্বয়ংক্রিয়তা (Automation)
৮. যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত (Logical Decision)
৯. বমুখিতা (Versatility)
১০. অসীম জীবনীশক্তি (Endless Life)

নিম্নে কম্পিউটারের উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্যগুলাের বিস্তারিত আলােচনা করা হলাে।
১. দ্রুতগতি (High speed)
বৈদ্যুতিক সিগন্যালের মাধ্যমে কাজ করে বিধায় কম্পিউটার খুব দ্রুতগতিতে কাজ করতে পারে। কম্পিউটার এক সেকেন্ডে কয়েক কোটি যােগ করতে পারে। কম্পিউটারে সময়ের একক হলাে ন্যানােসেকেন্ড, পিকোসেকেন্ড ইত্যাদি।

২. নির্ভুলতা (Correctness)
কম্পিউটার একটি মেশিন। মানুষের দেয়া সূত্র ও যুক্তির মাধ্যমে কম্পিউটার ফলাফল প্রদান করে। কম্পিউটার কখনও ভুল করে না। কম্পিউটারের নির্ভুলতা শতকরা ১০০ ভাগ।

৩. সূক্ষ্মতা (Accuracy)
কম্পিউটারের স্মৃতিশক্তি অনেক বেশি। তাই অনেক ঘর পর্যন্ত নির্ভুলভাবে গাণিতিক ক্রিয়াকলাপ করতে পারে। এ কারণে কম্পিউটারের সূক্ষ্মতা অনেক বেশি ধরে নেয়া যায়।

৪. বিশ্বাসযােগ্যতা (Reliability)
কম্পিউটার নির্ভুল ও সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। কাজ করার জন্য কম্পিউটার মানুষের দেয়া নির্দেশ ব্যবহার করে। কম্পিউটার ভুল করে না কিন্তু মানুষ করে, এটা প্রমাণিত।


৫. ক্লান্তিহীনতা (Dilligence)
কম্পিউটার একটি যন্ত্র। আর এ যন্ত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্লান্তিহীনতা। কম্পিউটার রাত দিন ক্লান্তিহীন, বিরক্তিহীন এবং বিশ্রামহীনভাবে কাজ করতে পারে।

৬. স্মৃতিশক্তি (Memory)
কম্পিউটারের নিজস্ব স্মৃতিশক্তি (Memory) আছে। কম্পিউটারের মেমােরিতে নির্দেশ (প্রােগ্রাম), প্রয়ােজনীয় ডেটা এবং প্রক্রিয়াজাত ফলাফল (ইনফরমেশন) সংরক্ষিত করে রাখা যায়।

৭. স্বয়ংক্রিয়তা (Automation)
কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের পরিবর্তে কম্পিউটারকে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া আরাে অনেক ক্ষেত্রে যেমন, কল-কারখানায়, বিস্ফোরক গবেষণায় কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।

৮. যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত (Logical Decision)
বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থা বিচার করে কী কাজ করতে হবে তার আগাম নির্দেশ দিয়ে রাখলে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন কাজ কম্পিউটার নিজে নিজে করতে পারে।

৯. ব্যবহারের বহুমুখিতা (Versatility)
বহুমুখী কাজে কম্পিউটারকে ব্যবহার করা যায়। কম্পিউটার একটি প্রােগ্রামনির্ভর যন্ত্র। যখন যে প্রোগ্রাম কম্পিউটারে লােড করা থাকে সে প্রােগ্রাম অনুসরণ করে কম্পিউটার কাজ করতে পারে। একটি কম্পিউটারে যেমন হিসাব-নিকাশের প্রােগ্রাম ব্যবহার করে হিসাব-নিকাশ করা যায় আবার মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে ছবি দেখা যায় বা গান শােনা যায়।

১০. অসীম জীবনসীমা (Endcess Life)
কম্পিউটার চালানাে হয় প্রােগ্রাম ব্যবহার করে। মানুষের জীবনের যেমন একটি নির্দিষ্ট সময় আছে কিন্তু গােগ্রামের কোন নির্দিষ্ট জীবনসীমা নেই। মানুষের তৈরি প্রোগ্রাম বছরের পর বছর সমান যােগ্যতায় একই মানে কাজ করে যেতে পারে। দীর্ঘদিন কাজ করার পরও প্রােগ্রামের কোন মানের কমতি হয় না।
কম্পিউটার দিয়ে কাজ করার সুবিধা 
কম্পিউটার দিয়ে কাজ করার অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। যথা-
১. কম্পিউটার খুব দ্রুত গতিতে কাজ করতে পারে।
২. নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়।
৩. মেমোরিতে অনেক তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা যায় এবং দ্রুত কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
৪. স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে থাকে।
৫. যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৬. ডেটা প্রসেসিং এর মাধ্যমে ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে।
৭. একই কম্পিউটার বহু ধরনের কাজ করতে পারে।
৮. কল্পনাহীনভাবে টানা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে।

 বিভিন্ন ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার 
১. ওয়ার্ড প্রসেসিং বা লেখালেখির কাজে টাইপরাইটারের বিকল্প হিসেবে অফিস আদালতে কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়।
২. ব্যাংকিং, শেয়ার বাজার ও ইনস্যুরেন্স ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে লেনদেনের হিসেব তৈরি ও সংরক্ষণের কাজে গতানুগতিক পদ্ধতি বাদ দিয়ে আজকাল কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।
৩. অফিসের যাবতীয় ব্যবস্থাপনার কাজে আজকাল কম্পিউটার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৪. শিল্প ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের কাজেও কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে।
৫. যন্ত্রপাতি, মোটরগাড়ি, জাহাজ, অ্যারোপ্লেন, ঘরবাড়ি, ব্রিজ ইত্যাদি ডিজাইন করার ক্ষেত্রে।
৬. বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক কাজে।
৭. একস্থান থেকে অন্যস্থানে সংবাদ প্রেরণের ক্ষেত্রে।
৮. শিক্ষাক্ষেত্রে।
৯. বিনোদনের ক্ষেত্রে যেমন টিভি দেখা, ভিডিও দেখা ও গান বাজানো ইত্যাদি।
১০. মুদ্রণশিল্পে প্রকাশনামুলক যে কোন কাজে।
১১. যোগাযোগ ব্যবস্থার টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ট্রান্সপোর্টের ডিরেকশন ও নির্ণয়ের কাজে।
১২. আধুনিক সামরিক বাহিনীতে নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে।
১৩. আবহাওয়া পূর্বাভাস পর্যবেক্ষণের কাজে।
Tags

কম্পিউটার কি এবং বিভিন্ন অংশ




কম্পিউটার একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা তথ্য বা ডেটা প্রক্রিয়া,সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার
করার ক্ষমতা রাখে। কম্পিউটার হল এমন একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র যা অতি দ্রুত নির্ভুলভাবে বিভিন্ন ধরনের গাণিতিক ও যৌগিক সমাধান দেয়। 1812 সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ব্যাবেজ গাণিতিক সমস্যা সমাধানে ডিফারেন্সিয়াল ইঞ্জিন এবং 1833 সালে এনালিটিক্যাল ইঞ্জিন উদ্ভাবন করে কম্পিউটারের জনক হিসেবে পরিচিত হন। কম্পিউটার বিভিন্ন প্রজন্ম অতিক্রম করে বিশাল আকৃতির কম্পিউটার থেকে ক্ষুদ্র  পামটপ কম্পিউটারে পরিবর্তন ঘটে। আমাদের বর্তমান দিনের কম্পিউটার কে মাইক্রোকম্পিউটার বলে অভিহিত করা হয়। মাইক্রো কম্পিউটার এর চারটি ভাগ ডেক্সটপ, ল্যাপটপ, নোটবুক ও পাম্প।



কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশ (পার্ট অফ কম্পিউটার)


কম্পিউটার সাধারণত তিন ধরনের অংশ দ্বারা গঠিত। ...

1) ইনপুট ইউনিট 2) সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট 3) আউটপুট ইউনিট।


ইনপুট এর মাধ্যমে ডেটা বা ডাটা কম্পিউটারে প্রবেশ করানো হয়, তারপর ওই   ডাটা মূল কার্যকারী
অংশের মাধ্যমে বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট এর মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের পর
আউটপুট এর মাধ্যমে দেখা যায়। 
1) ইনপুট ইউনিট : যে অংশগুলির মাধ্যমে ব্যবহারকারী কম্পিউটারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে সেই অংশগুলোক
বলে ইনপুট ইউনিট। মাউস, কিবোর্ড, ক্যামেরা ইত্যাদি ইনপুট ডিভাইস উদাহরণ।

3) সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা সিপিইউ: সমস্ত কম্পিউটার সিস্টেমের হার্ট বা প্রাণ স্বরূপ হল সি পি ইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। সাধারণত
সিপিইউ i) অ্যারিথমেটিক এবং লজিক্যাল ইউনিট ii) মেমরি ইউনিট iii)  কন্ট্রোল ইউনিট এই তিন ভাগে
বিভক্ত করা হয়।


i) অ্যারিথমেটিক এবং লজিক্যাল ইউনিট : যেকোনো ধরনের পার্টি গণিত সমীকরণ বা বিভিন্ন যৌগিক ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য অ্যারিথমেটিক এবং
লজিক্যাল ইউনিট দায়বদ্ধ থাকে।


ii) মেমরি ইউনিট:
মেমরি ইউনিট এ তথ্য ও প্রোগ্রাম ইত্যাদি সঞ্চয় করে রাখা হয়। মেমরি ইউনিট আবার দু'ভাগে বিভক্ত
a) হচ্ছে প্রাইমারি মেমোরি ও b) সেকেন্ডারি মেমোরি
a ) প্রাইমারি মেমোরি : কম্পিউটার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রোগ্রাম গুলো মেমোরিতে যে অংশের মধ্যে সঞ্চিত থাকে তাকে বলা হয় প্রাইমারি মেমোরি। সাধারণত প্রাইমারি মেমোরি রাম (RAM ) এবং রোম (ROM) দুইভাগে বিভক্ত
RAM (Random Access Memory) : বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহৃত তথ্যাদি এবং কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের ব্যবহৃত তথ্য এই মেমোরিতে  সঞ্চিত থাকে। এই মেমোরিতে সঞ্চিত তথ্যাদি পড়া ও লেখা উভয়ই সম্ভব। RAM মেমোরিতে সঞ্চিত তথ্যাদি উদ্বায়ী অর্থাৎ পাওয়ার সুইচ বন্ধ করা মাত্র এই মেমোরি তে সঞ্চিত তথ্য মুছে যায় বা ডিলেট হয়ে যায়, আর সেভ থাকে না।


ROM (Read Only Memory) : কম্পিউটার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি স্থায়ী প্রোগ্রাম গুলি এই
মেমোরিতে সঞ্চিত থাকে। সাধারণত এই মেমোরিতে কেবল পড়া বা দেখা সম্ভব। এই মেমোরিতে সঞ্চিত তথ্যাদি অনউদ্বায়ী। অর্থাৎ পাওয়ার সুইচ বন্ধ করা বা না করা সঙ্গে এই মেমোরিতে সঞ্চিত তথ্যাদি মুছে
যায় না।

b ) সেকেন্ডারি মেমোরি : এই মেমোরিতে বিপুল পরিমাণে তথ্যাদি সঞ্চিত করে রাখা যায়। এই মেমোরিতে প্রধানত স্থায়ী এবং ইচ্ছা
অনুযায়ী সঞ্চিত তথ্যাদি পরিবর্তন করা সম্ভব সেকেন্ডারি মেমোরি মধ্যে হার্ডডিক্স সিডি ডিভিডি ইত্যাদি
উল্লেখযোগ্য।


মেমোরি সঞ্চয় ক্ষমতা     Bit,
Byte =1024 Bit
Kilobyte (KB) = 1024 Byte
Megabyte(MB) =1024 KB
Gigabyte (GB) =1024 MB
Terabyte(TB) = 1024 GB


iii)  কন্ট্রোল ইউনিট :  এর সাহায্যে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বিভিন্ন ইউনিট এর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়।


সি পি ইউ বা সিস্টেম ইউনিট এর ভিতর সাধারণত যে অংশগুলি থাকে সেগুলি হল..

1)  Motherboard

i) Processor
ii) Math co-processor
iii) RAM (Random Access Memory)
iv) ROM (read only memory)
v) DIP (dual in-line package) switch (PC/XT only)
vi) Rechargeable battery (PC/AT and PS/2)
vii) Expansion slot or I/O slot
viii) Keyboard connector
ix) PS/2 Mouse connector
x) Parallel port
xi) Serial port
Xii) USB port
Xiii) Power connector

2) Hard disk controller

3) CD ROM driver controller

4)Display adapter
i) Monochrome graphics adapter(MGA)
ii) Colour graphics adapter (CGA)
iii) Enhanced graphics adapter (EGD)
iv)Video graphics adapter (VGA)
v) Super video graphic adapter (SVGA)

5) Power supply unit

6)   Trape driver controller

7)  Multi I/O card

8) Storage  devices ( HDD, CD-Rom/ DVD Drive )

3) আউটপুট ইউনিট: কম্পিউটার ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পাদনের পর যে 
অংশগুলি সহায়তায় কম্পিউটার সাধারণের বোধগম্য ভাষায় তা দৃশ্যমান করে তাকে বলে নির্গমন অংশ বা 
আউটপুট ডিভাইস।মনিটর বা ভিজুয়াল ডিসপ্লে ইউনিট, প্রিন্টার প্রজেক্টর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য 
আউটপুট ডিভাইস। আবার  মিউজিক শোনার জন্য সাউন্ড কার্ড হলো আরেকটি উল্লেখযোগ্য আউটপুট ডিভাইস।